শিশু না খাওয়ার ১০টি কারণ ও ২০টি সমাধান 👌

83
শিশু না খাওয়ার কারণ

শিশু খেতে চায় না কেন? শিশু না খাওয়ার কারণ কি? শিশুর কি ক্ষুধা পায় না! নিশ্চয়ই পায়, বড়দের চেয়ে তাদের ক্ষুধা বরং অনেক ঘন ঘন পায়। আসলে খাওয়ার ব্যাপারে যত অনিয়মই শিশুর না খেতে চাওয়ার অন্যতম কারণ।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের অনিয়ম অভিভাবকরা করেন না জেনে। কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চার আবদার মেটাতে গিয়েও কিছু বিপত্তি ঘটে। বাইরের লোভনীয় খাবারে শিশুকে অভ্যস্ত করে তুলেও কেউ কেউ শিশুর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নষ্ট করেন।

শিশু না খাওয়ার কিছু কারণ
Baby

অনেক অভিভাবক খাওয়ার মাঝে শিশুকে বিস্কুট, ফল, লজেন্স, আইসক্রিম ইত্যাদি খেতে দেন। অনেকে আবার সময় ধরে খাওয়ান—লক্ষ করেন না শিশুর পেটে ক্ষুধা আছে কি নেই। অনেকে শিশুর কান্না শুনলেই মনে করেন, তার বুঝি ক্ষুধা পেয়েছে।

অথচ শিশু কাঁদতে পারে অন্য অনেক কারণেই। কেউ কেউ তার শিশু একবেলা ঠিকমতো খায়নি বলেই অস্থির হয়ে যান। আবার সকাল ৭টায় পেট ভরে খায়নি বলে সকাল ৮টায় আবার খাওয়ানোর জন্য পীড়াপীড়ি করেন। এসব অভ্যাসই শিশুর জন্য ক্ষতিকর।

আরো একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে হজম হলেই শিশুর কিন্তু খিদে লাগবে। সে খাবেই। যদি খাওয়ার সুনির্দিষ্ট সময় ছাড়া শিশুকে খাওয়ানোর অভ্যাস করা হয়, তাহলে কিছু কিছু ক্ষতির শিকার হবে ওই শিশু।

« এক নজরে দেখুন এই প্রতিবেদনে কি কি রয়েছে »

শিশুর খাবারে অনিহা বা শিশু না খাওয়ার কারণ

শিশুর খাবারে অনিহা বা  শিশু না খাওয়ার কারণ
  • ১। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন খাবার গ্রহণ করা। রুটি খেয়ে কিছুক্ষণ পর আম, চকলেট খাওয়া। এতে ভাতের ক্ষুধা নষ্ট হয়।
  • ২। এক বছরের পর থেকে শিশুর বর্ধন আগের চেয়ে কমে যায়। এজন্য খাবার চাহিদাও কমে যায়। বাচ্চারাও কম খেতে চায়।
  • ৩। খাবারে এলার্জি থাকলে শিশু স্বাভাবিক খাবার খেতে চায় না। ৪-৮ শতাংশ শিশু খাবারে এলার্জির জন্য অনেক খাবার বা ফল খায় না। যেমন- শাক, ডিম, গরুর মাংস।
  • ৪। খাবার নিয়ে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া শিশুর না খাওয়ার একটি প্রধান কারণ। অবশ্যই শিশুর পছন্দ এবং খাবারের সময় ব্যবধান মাথায় রেখে খেতে দিতে হবে।
  • ৫। অনেক শিশুর অনেক খাবারের গন্ধ বা ধরনে সমস্যা থাকে। যেমন- অনেকে অতিরিক্ত নরম খাবার অপছন্দ করে। গন্ধের কারণে ফল ও শাকসবজি খেতে চায় না। একে texture sensitivity বলে।
  • ৬। টিভি, খেলনা, খেলার সাথী, মোবাইল, খাবার সব কিছু একসঙ্গে চললে শিশুর খাবারের দিকে মনোযোগ থাকে না। তখন শিশু কম খায়।
  • ৭। শিশু ক্লান্ত ও দুর্বল থাকলে খেতে চায় না। এজন্য ঘুম জড়ানো অবস্থা বা ক্লান্ত থাকলে শিশুকে খাবার দেওয়া ঠিক নয়।
  • ৮। খাওয়া একটি গোছালো প্রক্রিয়া। ভাত, রুটি, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, ফল, শাকসবজি গুছিয়ে প্লেটে আলাদা করে সাজিয়ে বাচ্চাদের পরিবেশন করা উচিত। তবে একসঙ্গে নয়, বিভিন্ন সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে।
  • ৯। এক ধরনের খাবার না দিয়ে বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়ান।
  • ১০। বাচ্চার পায়খানা ঠিকমতো হচ্ছে কি না তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পায়খানা ঠিকমতো না হলে গ্যাস হবে, অরুচি হবে।

আরো পড়ুন: শিশুর খাবার তালিকা ও বাচ্ছাদের জন্য ৩০টি স্মাট টিপস!

শিশু না খাওয়ার কিছু কারণ

শিশু না খাওয়ার কিছু কারণ
শিশু না খাওয়ার কারণ
  • যে খাবার পেটে আছে, তা ঠিকমতো হজম হবে না।
  • তার পরিপূর্ণভাবে খিদে লাগেনি বলে প্লেটের খাবার সে শেষ করতে পারবে না।
  • শিশুকে যখন-তখন চিপস, জুস, চকলেট বা এই ধরণের খাবার দেওয়া যাবে না, এতে খিদে নষ্ট হয়।
  • যখন-তখন খাবার দেওয়ার কারণে যথাসময়ে তার খিদে লাগবে না।
  • শিশু খাবারের যথাযথ স্বাদ অনুভব করতে পারবে না।
  • খেতে পারছে না বলে ওই খাবারের প্রতি তার এক ধরনের বিরক্তি তৈরি হবে।
  • জোর করে খাবার দিলে বমি ও অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেবে।

২ থেকে ১৪ বছরের বাচ্ছারা না খাওয়ার কারণ

খাওয়া নিয়ে বাচ্চাকে জোর করা উচিত নয়। মডেল: রঙ্গন ও বর্ণা। ছবি: অধুনা

বাচ্চা খেতে চায় না। শিশু না খাওয়ার কারণ নিয়ে অভিভাবক, বিশেষ করে মায়ের চিন্তার শেষ নেই। নানা উপায়ে মায়েরা শিশুদের খাওয়াতে চেষ্টা করেন। শিশুর বয়স অনুযায়ী না খাওয়ার কারণ ও খাদ্য উপকরণের ভিন্নতা দেখা যায়। শিশু না খাওয়ার কারণ কি? খাদ্যতালিকায় কী উপকরণ রাখবেন—সেটাই দেওয়া হলো।

আরো পড়ুন: শিশুকে চতুর ও বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির বিশেষ ১০টি কৌশল

২ থেকে ৬ বছর

এ বয়সী বাচ্চাদের না খাওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। ছোট বাচ্চাদের খাবার খাওয়ানোর ক্ষেত্রে দুটো ভুল ধারণা রয়েছে। একটা হলো অল্প খাবারে পরিপূর্ণ পুষ্টি দেওয়ার চেষ্টা করা।

  • ধরা যাক, খিচুড়িতে চাল-ডালের চেয়ে সবজি যদি বেশি হয় বা চার-পাঁচ রকমের সবজি হয়, তাহলে খাবারটা স্বাদহীন হয়ে যায়।
  • দ্বিতীয় জিনিস হলো, খাবারটি যদি মিশ্রিত খাবার হয়, তাহলে ওই খাবার বাচ্চা বেশি দিন পছন্দ করে না।
  • তৃতীয় হচ্ছে, একই রকমের খাবার।

একই খাবার যদি প্রতিবেলায় দেওয়া হয়, তাহলে ওই খাবার পছন্দ করে না। বাচ্চারা একই রকম খাবার কখনোই খেতে চায় না। বাচ্চাদের খাবার তৈরি সময় একটি জিনিস খেয়াল রাখতে হবে, উপকরণগুলো ঠিক রেখে রান্নার পদ্ধতিটা পরিবর্তন করে নেওয়া।

৬ থেকে ১৪ বছর

এ বয়সে বাচ্চা স্কুলে যাওয়া শুরু করে। শিশুরা ঘুম থেকে উঠেই স্কুলে যায়। স্কুলে যাওয়ার আগে ওই সময়ে বাচ্চা কিছু খেতে চায় না। সকালে না খেয়ে বাচ্চারা স্কুলে যাওয়ার পর যখন ক্ষুধা লাগে, তখন তারা ঘরের খাবার (বাড়িতে বানানো খাবার) না খেয়ে জাঙ্ক ফুড খায়।

জাঙ্ক ফুড খাওয়ার ফলে তাদের অল্প একটু খেলেই পেট ভরে যায়। তখন মূল খাবারটা (বাড়িতে বানানো খাবার) খেতে চায় না। ফলে মা বলেন, তাঁর বাচ্চা খাবার খাচ্ছে না।

পূর্ণভাবে খিদে

পরিপূর্ণভাবে খিদে না লাগলে শিশুরা খেতে চায় না। এছাড়া জোড় করে খাওয়ানো ভালোভালে খুদা লাগেনি বলে প্লেটের খাবার সে শেষ করতে পারবে না।

শিশু অসুস্থতা

শিশু ঠাণ্ডা, জ্বর বা পেট খারাপ থাকলে অরুচি থেকে খাবার গ্রহণ সাময়িকভাবে বন্ধ করতে পারে। তবে তা ঠিক হয়ে যায়। যদি শিশুর পেটে বা অন্ত্রে কোনো জটিলতা থাকে, তবে ডাক্তার দেখাতে হবে।

খেতে চায়না বলে ঘন ঘন খাবার খাওয়ানো

ঘন ঘন খাবার দেওয়া বাংলাদেশি মায়েদের একটি মারাত্মক ভুল। শিশুকে শক্ত খাবার তিন ঘণ্টা পর পর দেওয়া উচিত। এর মাঝে অল্প বুকের দুধ দেওয়া যেতে পারে। অনেক সময় ঘন ঘন খাবার দেওয়ায় শিশুর বমি ও ডায়রিয়া হয়।

আরো পড়ুন: শিশুকে মায়ের দুধ পানের বিশেষ কিছু কৌশল ও পরামর্শ

অতিরিক্ত দুধ খাওয়ানো

বুকের দুধ বা আলগা দুধ ৬ মাস বয়স থেকে আগের তুলনায় কমিয়ে আনতে হয়। তা না হলে শক্ত খাবার খাওয়ার জায়গা পেটে থাকে না। ছোট্ট শিশুর পেটও ছোট থাকে। এ বিষয়টি মাথায় থাকা উচিত।

নরম খাবার

শিশুকে নতুন খাবার নরম করে দিতে হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ও শক্ত খাবারে অভ্যস্ত করা ভালো। কেননা, শিশুর রুচি পরিবর্তন হয়। তা না হলে শিশু খাবারে অনীহা প্রকাশ করে।

যখন-তখন খাবার

শিশু না খাওয়ার কারণ না খুঁজে শিশুদের রুটিন মাফিক খাওয়ালে ভালো। যখন-তখন খাবার দেওয়ার কারণে যথাসময়ে তার খিদে লাগবে না। আর সে খেতে পারবে না। অনেক শিশু স্কুল থেকে ফিরেই বিস্কুট, ফল বা ফলের রস ইত্যাদি খায়।

তার এক ঘণ্টা পর হয়তো দুপুরের খাবারের সময়। তখন সে ঠিকমতো খেতে চাইবে না, কারণ ইতিমধ্যেই তার খিদে নষ্ট হয়ে গেছে। আবার অনেক শিশু সারা দিন ইচ্ছামতো যখন-তখন বিস্কুট, ফল, লজেন্স, আইসক্রিম ইত্যাদি খেয়ে পেট ভর্তি করে রাখে। কিন্তু মূল খাবারের সময় তেমন কিছুই খায় না।

খাবারের স্বাদ

শিশুর পছন্দসই খাবার রান্না করুন। শিশু খাবারের যথাযথ স্বাদ অনুভব করতে পারবে না। খেতে পারছে না বলে ওই খাবারের প্রতি তার এক ধরনের বিরক্তি তৈরি হবে।

সময়সূচি অনুযায়ী খেতে দিন

বয়সভেদে শিশুর ক্ষুধা লাগার সময়ে কিছুটা পার্থক্য আছে। আপনার শিশুকে সব সময় নিয়ম বা সময়সূচি অনুযায়ী খেতে অভ্যস্ত করে তুলুন। কী খাওয়াচ্ছেন, তার চেয়ে বড় কথা হলো, কখন খাওয়াচ্ছেন।

আরো পড়ুন: বাচ্ছাদের মনোযোগ বৃদ্ধির বৈজ্ঞানিক ১৫টি কৌশল!

শিশু না খাওয়ার কারণ—এ অজুহাতে তাকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় খাবার দেবেন না। শিশু একেবারেই খেতে না চাইলে প্রয়োজনে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। যখন-তখন খাবার দিয়ে তার খিদে নষ্ট করবেন না।

খাবারের বিরতি

সাধারণত দুই থেকে তিন বছর বয়সী বাচ্চাদের প্রতিবেলা খাবারের মাঝে দুই থেতে তিন ঘণ্টা বিরতি থাকা উচিত। বিরতির এই সময়ে যদি অন্য কোনো খাবার সে না খায়, তবে যথাসময়ে তার ক্ষুধা লাগার কথা।

তিন থেকে চার বছর বয়সীদের জন্য তিন থেকে চার ঘণ্টা বিরতিতে খাবার দেওয়া উচিত। এভাবে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কিশোর বয়স পর্যন্ত প্রতিবেলা খাবারের মাঝের বিরতি একটু করে বাড়বে। এরপর বড়দের সঙ্গে তিন বেলা খাবারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

অযথা জোর করবেন না

শিশুকে কখনো জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না। তাকে একবার জোর করে খাওয়ালে পরে যখনই তাকে খাওয়াতে চাইবেন, তখনই সে ভয় পাবে। খাবারের প্রতি তার আগ্রহ কমে যাবে। একসময় খাবারের প্রতি তার বিতৃষ্ণা জন্মাতে পারে।

খাওয়ার সময় টিভি বা কার্টুন দেখা নয়

শিশুদের টিভি বা কার্টুন দেখিয়ে খাবার খাওয়ালে এগুলোতে সে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। এমনিতেই বেশি সময় টিভি দেখা শিশুর জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।

টিভি দেখার সময় খাওয়ালে শিশুর বদহজম হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। কারণ এ সময় টিভিতে মনোযোগ থাকার কারণে পাকস্থলী থেকে প্রয়োজনীয় পাচক রস নিঃসৃত হয় না।

খাবারে ভিন্নতা আনুন

প্রতিদিন এক ধরনের খাবার না দিয়ে খাবারে ভিন্নতা আনুন। যদি তার মনের ভাব সে প্রকাশ করতে পারে, তবে সে যা খেতে চায় তা জেনে নিন। তার পছন্দমতো খাবার স্বাস্থ্যসম্মতভাবে তৈরি করে খেতে দিন। বাইরের খাবরের অপকারিতা সম্পর্কে তাকে বলুন।

বাইরের খাবার

বাইরের খাবার যে একেবারেই দেবেন না তা নয়। যখন বড়দের সঙ্গে কোথাও পার্টিতে যাবে বা পরিবারের সবার সঙ্গে কোথাও ঘুরতে যাবে, নিশ্চয়ই বাইরের খাবার সে খেতে পারবে। তবে তার জন্য আলাদা করে প্রতিদিন বাইরের খাবার ঘরে আনবেন না বা তাকে বাইরে খেতে নিয়ে যাবেন না।

শিশুর খাবার গ্রহণে আগ্রহ বাড়ানোর উপায়

শিশুর খাবার গ্রহণে আগ্রহ বাড়ানোর উপায়
Cute Baby

শিশুকে বিভিন্ন খাবারে আগ্রহী করে তুলতে প্রয়োজন নানা ধরনের খাবার, নানা ধরনের রন্ধন পদ্ধতি। রুটি, ডিম, মাছ, মুরগি, শাকসবজি, ফল সব কিছু খাওয়ার অভ্যাস করাতে হবে। শিশু যখন প্রথম খাবার আরম্ভ করে তখন থেকেই অল্প অল্প করে শাকসবজি দেওয়া যেতে পারে।

আলু, গাজর, পেঁপে, বিচি ছাড়া পটল, জালি, ঝিঙা বাচ্চারা খায়। এরপর এক বছর বয়সে শাক দিন। দেখুন হজম হয় কীভাবে। শাক ঠিকভাবে হজম হলে অন্য শাক খেতে দিন। ফলের মাঝে প্রথমে চটকান কলা, আপেল, লেবু বা মাল্টার রস, আনারের রস বেশ ভালো।

আস্তে আস্তে দাঁতের সংখ্যা ও শক্ত দাঁতের ওপর অন্য ফল দেওয়া যেতে পারে। সেরিলাক বাচ্চার ক্ষুধা নষ্ট করে। সেরিলাকের বদলে ওটস, রুটি, সুজি, সাগু ইত্যাদি দেওয়া যেতে পারে। প্রথম থেকেই মাছ-শাকসবজি খাওয়ালে শিশু এসব খাবারের সঙ্গে পরিচিত থাকে।

পরবর্তীকালে এসব খাবার খেতে অনীহা প্রকাশ করে না। অনেক শিশু ডিম খেতে চায় না। সেক্ষেত্রে ডিমের স্যুপ বা পুডিং, ডিম রান্না করে খাওয়ানো যেতে পারে।

দুধের বদলে পুডিং, ছানা, দই, মিষ্টি, সেমাই দেওয়া যেতে পারে। শিশুর বর্ধনে প্রোটিন জাতীয় খাদ্য মাছ, মাংস, দুধ, ডিম বেশি থাকা দরকার। শাকসবজি অল্প থাকলেও সমস্যা নেই। কিন্তু প্রতিদিন অল্প শাকসবজি খেতে হবে।

মাঝে মাঝে শাকসবজি ভাজি করে বা খিচুড়ির ভেতরে দিয়ে খাওয়ান। চাইনিজ ভেজিটেবল রান্না করুন। এতে ডিম দিয়ে দিন। তাতে পুষ্টি ও স্বাদ দুটিই বাড়বে। মাংস চিকেন ফ্রাই বা কাবাব করে খাওয়ানো যেতে পারে। যেসব শিশু মাছ খেতে চায় না তাদের মাছের বড়া করে দিন।

নুডলস করে খাওয়ালে তাতে ডিম, মাংস, চিংড়ি, সবজি দিন। শিশুর খাবারে testing salt দেওয়া নিষেধ। শিশু যেন আলগা লবণ না খায়। এতে স্বাদ নষ্ট হয়। শিশুর ঠাণ্ডা লাগলে চা দেওয়া যাবে না। গরম স্যুপ দেওয়া যেতে পারে।

শিশুকে খাওয়ানোর নিয়ম

শিশুকে খাওয়ানোর নিয়ম
শিশুকে খাওয়ানোর সঠিক নিয়ম

২ থেকে ৬ বছর

২ থেকে ৬ বছরের বাচ্চাদের খাবার দিতে হবে তিন ঘণ্টা পরপর। খাবারটা হতে হবে ওই বয়সে উপযোগী সুষম খাবার। ২ বছরের একটা বাচ্চা সাধারণত ঘরের তৈরি খাবার খাবে। ভাত, মাছ, সবজি, ডাল, দুধসহ যা যা খাওয়া হয়, তা-ই বাচ্চাদের খাওয়ানো উচিত।

বাচ্চাদের খাবারে ঝাল কম দিতে হবে। বাইরের খাবার খাওয়া একদম বন্ধ করে দিতে হবে। বাচ্চা যদি বাড়িতে বানানো খাবার খাওয়ার আগে বাইরের খাবার খায়, তাহলে সে ঘরে রান্না করা খাবার খাবে না। ধরুন, বাচ্চা দুপুরের খাবার দুইটার সময় খাবে, কিন্তু দেখা গেল দেড়টার সময় চিপস বা বিস্কুট খেলো।

তাহলে কিন্তু তার ক্ষুধাটা মরে যাবে। ঘরে রান্না করা খাবার খাবে না। বাইরে খাওয়ার পর বাচ্চার পেট ভরে গেল ঠিকই, কিন্তু পরিপূর্ণ পুষ্টি পেল না। ফলে ঘরে রান্না করা খাবার খাবে না। এ জন্য অভিভাবককে একটু সময় নিয়ে বাচ্চাকে পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার খাওয়াতে হবে।

একটি খাবার থেকে আরেকটি খাবার গ্রহণের মধ্যে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা বিরতি দিতে হবে। এই বিরতির মধ্যে তাকে পানি খাওয়ানো যেতে পারে, বাইরের খাবার খাওয়ানো যাবে না। তার মানে বাচ্চাকে খিদে লাগিয়ে খাবার দিতে হবে।

আরেকটি বিষয় হলো, বাচ্চা যে শুধু ভাতেই খাবে, তা কিন্তু নয়। পরিবারে যে খাবারগুলো রান্না হয়, সে অনুযায়ী বাচ্চাদের খাবার দিতে হবে। যেমন কোনো বাচ্চা ভাত খেতে পারে, আবার কেউ রুটি, কেউবা পরোটা খেতে পারে। চাইলে বাচ্চাকে নুডলস বা কেকও খাওয়ানো যেতে পারে।

আরো পড়ুন: যদি আপনি প্রতিদিন আঙ্গুর খান তাহলে কি হয় দেখুন!

মায়েরা বাচ্চাদের নিয়ে একটি বিষয় সব সময় বলেন, বাচ্চারা ভাত খেলো না মানে সে কিছুই খেলো না। কিন্তু বিষয়টা কিন্তু তা নয়, বিষয়টা হচ্ছে খাবারে শর্করা, চর্বি, ভিটামিন, মিনারেলের সমন্বয় সুষম আছে কি না, সেটা—যা খাবারের যেকোনো উপকরণেই থাকতে পারে।

কোনো বাচ্চা যদি খিচুড়ি খেতে না চায়। সে যদি পুডিং খায় বা বাড়িতে বানানো কেক খায়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। বাচ্চা যেটা পছন্দ করে এবং সেটা যদি তার জন্য উপযুক্ত হয়, তাহলে সেটা আপনি আপনার সন্তানকে খাওয়াতে পারেন।

৬ থেকে ১৪ বছর

এই বয়সী বাচ্চাদের প্রথম না খাওয়ার কারণ হলো স্কুল। প্রত্যেক বাচ্চাকে খাবার খাইয়ে তারপর স্কুলে পাঠাতে হবে। যে খাবার সন্তান অল্প সময়ের মধ্যে নিতে পারে, সেই খাবারটিই স্কুলে যাওয়ার আগে খাওয়াতে হবে।

যেমন স্কুলে যাওয়ার আগে সন্তানকে মিল্ক শেক বা দুধের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে খাওয়াতে পারেন বা দুধ দিয়ে বানানো অন্য কোনো খাবার। এ খাবার উপকরণটি অল্প সময়ে বানানো যায় এবং অল্প পরিমাণ খেলেও সে পরিপূর্ণ পুষ্টি পাবে। টিফিনের খাবারটি বাড়ি থেকে বানিয়ে দিতে হবে।

সেটা হতে পারে তার জন্য বানানো সকালের নাশতা এবং স্কুলের টিফিনটি সন্তানের পছন্দমতো খাবারই দিতে হবে। না হলে সে খাবে না এবং সময়মতো খাওয়াতে হবে। অনেক বাচ্চা স্কুলে না খেয়ে থাকে বা টিফিনে জাঙ্ক ফুড খায়। বিষয়টা অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে।

১০ বছরের বেশি বয়সী বাচ্চাদের খাবারের একটা পছন্দ তৈরি হয়ে যায়। তারা তখন বন্ধুবান্ধবের খাবারগুলো দেখে। তাই এ ক্ষেত্রে বাচ্চার পছন্দের কাছাকাছি মানের খাবারগুলো দিতে হবে।

মায়ের পছন্দ অনুযায়ী খাবার চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। টিফিনের খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রে বাচ্চার পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সবচেয়ে ভালো হয় বাড়িতে বানানো খাবারের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে বাচ্চাকে বুঝিয়ে খাবার খাওয়ানো। ৬ থেকে ১৪ বছরের বাচ্চার সবচেয়ে বেশি পুষ্টিগত ঘাটতি তৈরি হয়।

আরো পড়ুন: বাচ্চা মোটেই খেতে চায় না? দেখে নিন ৩০টি স্মাট উপায়!

কারণ, এ সময় বাচ্চাদের নিজস্ব একটা পছন্দ তৈরি হয়। কিন্তু বাচ্চা তো তার জন্য কী পরিমাণ পুষ্টি দরকার, সেটা জানে না। ফলে সে যে খাবারটি খায়, তাতে পরিপূর্ণ পুষ্টি থাকে না এবং ঘাটতি তৈরি হয়।

এ বয়সী বাচ্চাদের জন্য একটা বা দুটো ডিম, এক টুকরা মাছ বা মাংস, এক গ্লাস দুধ অবশ্যই রাখতে হবে। এ উপকরণগুলো কীভাবে খাদ্যতালিকায় যুক্ত করা হবে, সেটা তার পারিবারিক খাবারের ধরনের ওপর নির্ভর করবে।

কেউ সরাসরি দুধ খাবে, আবার কেউ পুডিং খাবে। আবার কেউবা মিল্ক শেক খাবে। অর্থাৎ যে মিল্ক শেক খায়, তাকে যদি সরাসরি দুধ খেতে দেওয়া হয়, তাহলে সে কিন্তু সেটা খাবে না। তাই পরিবার ও বাচ্চার পছন্দ অনুযায়ী খাবার খাওয়ানোই উচিত।

এছাড়া শিশু না খাওয়ার আরো কিছু কারণ রয়েছে

শিশু না খাওয়ার আরো কিছু কারণ রয়েছে

বাবা-মায়ের ভূমিকা

শিশুকে খাওয়ানোর ব্যাপারে বাবা-মায়ের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। খাওয়ানোর সময় শিশুর সঙ্গে সংবেদনশীল আচরণ করতে হবে। খাবারকে শিশুর কাছে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করতে হবে।

শিশুর খিদে না থাকলেও তাকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করা অনুচিত এতে রুচি কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, জোর করার কারণে খাবারের প্রতি শিশুর মনে ভয় ও অনীহা জন্ম নেয়। তাই জোর না করে নিয়মমতো খাওয়ার ব্যাপারে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে।

শিশুকে সময় কম দেওয়া

শিশুর প্রতি বাবা-মায়ের মনোযোগ কমে গেলেও সে খাওয়া কমিয়ে দিতে পারে। ব্যস্ততার কারণে অনেকে হয়তো শিশুকে ঠিকমতো সময় দিতে পারেন না। শিশুর যত-পরিচর্যা কম হয়। এতে করে বাচ্চার রুচি কমে যায়, শিশুর বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলে।

মানসিক চাপ

শিশুর যদি রুচি কমে যায়, ঘুম কম হয় এবং সব সময় তাকে বিরক্ত মনে হয়, তবে বুঝতে হবে কোনো কারণে শিশুটি মানসিক চাপে ভুগছে। মানসিক চাপ শিশুর রুচি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এ সময় শিশুকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে।

মানসিক চাপ কমিয়ে তাকে হাসিখুশি রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণত শিশুরা ভয় পেলে, একাকী থাকলে কিংবা বাবা-মায়ের কাছ থেকে কম সময় পেলে মানসিক চাপে ভোগে।

শারীরিক অসুস্থতা

শারীরিক অসুস্থতার কারণে শিশুর খাওয়ার রুচি কমে যায়। সাধারণত জ্বর, গলা ব্যথা, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, কিংবা ডায়রিয়া হলে শিশুর খাবারের পরিমাণ কমে যায়। সাধারণত সুস্থ হয়ে উঠলেই বেশিরভাগ শিশুর রুচি ঠিক হয়ে যায়।

শিশুর শারীরিক অসুস্থতার সময় খাবারের বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। এ সময় শিশুকে অল্প-অল্প করে বারবার খাওয়াতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত সুস্থতার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ মতো চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।

কৃমির সংক্রমণ

কৃমির সংক্রমণ শিশুদের শরীরে বিরূপ প্রভাব ফেলে। কৃমি শিশুর পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে সেখানে পরজীবী হিসেবে অবস্থান করে।

এর ফলে শিশুর নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। রুচিও কমে যায়। কৃমির সংক্রমণ হলে শিশুকে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী কৃমির ওষুধ খাওয়াতে হবে।

রক্তশূন্যতা

রক্তশূন্যতা রুচি কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। রক্তশূন্যতায় ভোগা শিশুরা অন্য শিশুদের তুলনায় দুর্বল ও ক্লান্ত থাকে। এরা বেশিরভাগ সময়ই বিরক্ত থাকে এবং প্রায়ই কান্নাকাটি করে। সময়মতো রক্তশূন্যতার চিকিৎসা না করালে এসব শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, বাচ্চার ওজন বয়সের তুলনায় বেশি অথচ বাবা-মায়ের অভিযোগ শিশুটি একদম খায়ই না। এই ধরনের পরিস্থিতিতে বাবা-মাকে বুঝাতে হবে যে, শিশু যদি ঠিকঠাক না খেত তাহলে তার ওজন বেশি হতো না।

এরপরও যদি জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয় তবে তা শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আর যদি দেখা যায় বাচ্চা ঠিকঠাক বাড়ছে না এবং বয়সের তুলনায় ওজন অনেক কম বা অতিরিক্ত বেশি তাহলে দ্রুত কোনো শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রিয় পাঠক, আপনিও সম্ভব ডটকমের অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল বিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, বিস্ময়কর পৃথিবী, সচেতনমূলক লেখা, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ ইনবক্স করুন- আমাদের ফেসবুকে  SOMVOB.COM লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।