বাচ্ছাদের মনোযোগ বৃদ্ধির বৈজ্ঞানিক ১৫টি কৌশল!

526
শিশুর মনোযোগ বৃদ্ধির উপায়

শিশুর মধ্যে সৃজনশীলতার বীজ থাকে তার জন্ম থেকেই। এরপর সে যখন বড় হতে থাকে তার আশেপাশের পরিবেশ এবং মানুষেরা তার সৃজনশীলতাকে পজিটিভ অথবা নেগেটিভভাবে ইনফ্লুয়েন্স করে। তবে দুঃখের কথা হচ্ছে এক্ষেত্রে পজিটিভের চেয়ে নেগেটিভের মাত্রাই বেশি।

আমাদের স্কুল এবং আমাদের বাসায় আমরা যেভাবে শিশুদের বড় করি সেটি মূলত শিশুর জন্মগত সৃজনশীলতাকে ধীরে ধীরে চাপা ফেলে দেয়। ৩-৪ বছর বয়স হতে না হতেই বইয়ের বোঝা বইয়ে হয়। স্কুলের গৎবাঁধা নিয়ম, মুখস্থ করার বাহার, হোমওয়ার্ক এবং পরীক্ষার চাপে ৫-৬ বছর বয়স থেকেই এখন আমাদের শিশুদের শৈশব হারাতে বসে। 

« এক নজরে দেখুন এই প্রতিবেদনে কি কি রয়েছে »

মনোযোগ বৃদ্ধিতে স্বাস্থ্যকর খাবার

সকালের নাস্তা

শিশু কিশোরদের মনোযোগের অভাব হওয়ার একটি বড় কারণ হল শরীরে শর্করার অভাব। আর এই অভাব মেটানোর অনন্য একটি উপায় হল সকালের নাস্তায় শষ্যজাতীয় খাবার খাওয়া। এখানে থাকতে পারে লাল-চাল কিংবা ভুট্টার বিভিন্ন পদ।

সময়ের অভাবে রান্না করা সম্ভব না হলে শষ্য ব্লেন্ড করে মিশিয়ে দিতে পারেন পানীয়তে। সকালের নাস্তায় শষ্যাজাতীয় খাবার থাকলে শিশুর দীর্ঘসময় পেট ভরা থাকবে। ফলে দুপুরের খাবারের আগ পর্যন্ত স্কুলের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সমস্যা হবে না।

চিনি কম খাওয়ান

সন্তান বাইরে কী খাচ্ছে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই ঘরের খাওয়ার উপর চাই কড়া নিয়ন্ত্রণ। এজন্য চিনির ক্ষতিকর দিকগুলো যাতে সবসময় তাদের চোখে পড়ে এমন ব্যবস্থা করতে পারেন। যেমন- কাগজে লিখে ফ্রিজের গায়ে এঁটে রাখা।

তবে হুট করে চিনি বন্ধ করা যাবে না, ধীরে ধীরে কমাতে হবে। যেমন- এক গ্লাস দুধে আপনার সন্তান যদি দুই টেবিল-চামচ চিনি খায় তবে ধীরে ধীরে তা দেড় চামচ এবং তারপর এক চামচে নামিয়ে আনতে হবে।

স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস

স্টার্চ বা স্নেহজাতীয় খাবার স্ন্যাকস বা হালকা খাবার হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর। এরমধ্যে থাকতে পারে মিষ্টি আলু। সিদ্ধ করা মিষ্টি আলু দেখলে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষই দুরে দুরে থাকে। শিশু কিশোরদের কথা তো বলাই বাহুল্য। তাই মিষ্টি আলু বেইক করে চিপস বানিয়ে নিতে পারেন।

বিশেষ কিছু কৌশল

প্রতিদিনকার কাজগুলো নিজেকেই করতে দিন

যে শিশু নিজের কাজগুলোর জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীল, সেই শিশু কখনো গভীর চিন্তা করতে পারে না। তাই শিশুদের নিজের কাজগুলো নিজেই করা শিখতে হবে। সেটি নিজে নিজে খাওয়া, নিজের ঘর এবং জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা, নিজের স্কুলের কাজ নিজে করতে শেখা ইত্যাদি হতে পারে।

ক্রিয়েটিভ কাজ করার জিনিস কিনে দিন

শিশুদের বিভিন্ন ধরনের ক্রিয়েটিভ কাজ করার জিনিস যেমন রঙ পেন্সিল, লেগো সেট, ক্র্যাফটের জিনিসপত্র, গল্পের বই ইত্যাদি কিনে দিন। এতে করে তাদের কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটবে। তারা নিজে নিজে নানা জিনিস বানাবে, পড়বে এবং ভাবতে শিখবে

অসাধারণ ব্যবহার

সাধারণ এবং চোখের সামনের জিনিশগুলোর নানারকম ভিন্নধরণের ব্যবহার আলোচনা করতে পারেন শিশুদের সাথে। যেমনঃ ক্রিকেট খেলার জন্য স্ট্যাম্প না থাকলে লাঠির ব্যাবহার, শক্ত কার্ডবোর্ড দিয়ে পুতুলের ঘর বানানো, প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে গাছের টব অথবা পেন হোল্ডার বানানো ইত্যাদি এরকম আরো অনেক কিছু। শিশুরা নিজ থেকে কিছু বানালে তার প্রশংসা করতে হবে। তাকে বাহবা দিতে হবে যাতে তারা এরকম আরো অনেক কিছু তৈরী করতে পারে। প্রশংসা করার ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে যেন খালি সঠিক হলেই প্রশংসা পাবে এরকম না। তার চেষ্টাকে উৎসাহ দিন, ফাইনাল রেজাল্টকে নয়।

শিশুর মনোযোগ বৃদ্ধির উপায়

আরো পড়ুন: যদি আপনি প্রতিদিন আঙ্গুর খান তাহলে কি হয় দেখুন!

শিক্ষামূলক গল্প শোনান

গল্প শেষ হওয়ার পর তাকেই জিজ্ঞেস করুন যে সে এই গল্প থেকে কি শিখতে পেরেছে। এর জবার দেয়ার জন্য তাকে পুরো গল্পটা মাথার মধ্যেই পুনরায় চিন্তা করতে হবে। গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। তবে মাথায় রাখুন যে বেশি ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণ গল্প হলেই হবে। সবসময় যে শিক্ষামূলক গল্প শুনাতে হবে এমন নয়। ৪ বছর বা তার চেয়ে ছোট শিশুরা সাধারণত শিক্ষামূলক গল্পগুলোর ম্যাসেজগুলো ধরতে পারে না। খেয়াল রাখুন যেন গল্পগুলো বেশ ছোট হয় এবং প্রতি পাতায় বড় করে ছবি থাকে। ৪-৫ বছরের চেয়ে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে গল্পের বই কেনার সময় মাথায় রাখবেন যেন গল্পের বই ১০-১৫ পৃষ্ঠার বেশি না হয় এবং প্রতি পৃষ্ঠায় ৩-৪ লাইনের বেশি যেন না থাকে।

সৃজনশীলতা নিয়ে কথা বলুন

শিশুদের সাথে সৃজনশীলতা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। তারা কখন তাদের ভালো আইডিয়াগুলো পেয়ে থাকে অথবা কি করলে তারা আনন্দ পায় এরকম বিষয়গুলো আলোচনা করে, সেই বিষয়গুলো যাতে বেশি বেশি হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

নিজের কাজ নিজেকে করতে দিন

এতে করে তারা ধীরে ধীরে নিজের জীবনের জন্য ভালো বিষয়গুলো বুঝতে পারবে। তাদের মধ্যে কনফিডেন্স তৈরি হবে। যেমনঃ দুপুর অথবা রাতের খাবারে কি খাবে, ঈদে কি রকম জামা কিনবে, সাপ্তাহিক ছুটিতে কোথায় বেড়াতে যাবে ইত্যাদি। এটার ফলে তারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখে। এই জিনিশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ চর্চা তাদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করার জন্য। শিশু কনফিডেন্ট হলে রিস্ক নিতে শিখে। ভুল থেকেই সৃজনশীলতা আসে। যে শিশু কখনও ভুল করে না, বা তাকে ভুল করার সুযোগ দেয়া হয় না, সে শিশু পরবর্তীতে ভুল করতে ভয় পায়।

খেলা করুন

শিশুর বয়স ২-৪ বছরের মধ্যে হলে প্রতিদিন অন্তত ১-১.৫ ঘণ্টা সময় বের করুন মা-বাবা মিলে। দুজন ভাগাভাগি করে অন্তত এই সময়টুকু তাকে দিন। এই খেলার সময়ে নিজের স্মার্টফোন দূরে রাখুন, টিভি অফ রাখুন। টিভি ছেড়ে রেখে শিশুর সামনে কিছু খেলনা দিয়ে খেলতে বলে নিজে স্মার্টফোন অথবা টিভি দেখা শুরু করবেন না যেন। এতে বরং ভালোর চেয়ে খারাপ হবে। প্রতিদিন এই খেলাটা শিশুর কল্পনা শক্তি এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করবে। একই সাথে আপনার এবং আপনার শিশুর মধ্যে গভীর সম্পর্ক তৈরি করবে। বাবাদের জন্য এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য।

মনোযোগ বৃদ্ধির সেরা উপায়সমূহ

এখনে শুধুমাত্র বাচ্ছাদের বা শিশুদের মনোযোগ বৃদ্ধি করবে তা না! এখানে সব বয়সীদের জন্য এই নিয়ম মেনে চললে, সকল বয়সীদের জন্য মনোযোগ বৃদ্ধির বেশ উপকারী।

আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা

আপনার শিশু কোন উপায়ে শিক্ষা গ্রহণে সবচেয়ে আনন্দ পায় তা জেনে নিন। অনেক শিশুই শিক্ষার পাশাপাশি গান, নাচ, অঙ্গভঙ্গি, অভিনয়, আঙুল গননা কিংবা ভিন্ন কোনো উপায়ে খুব ভালো শিখতে পারে। তাই আপনার শিশুর জন্য সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি কোনটি তা জানুন ও শিক্ষায় কাজে লাগান।

আরো পড়ুন: বাচ্চা মোটেই খেতে চায় না? দেখে নিন ৩০টি স্মাট উপায়!

শিক্ষা বিনিময়

শুধু পাঠ্যবইতেই শিশুকে সীমাবদ্ধ রাখবেন না। আপনার শিশু কোন কোন বিষয় শিখল তা তার কাছ থেকে বিস্তারিত জেনে নিন। এ বিষয়ে নিজের জ্ঞান থাকলে তাও তাকে জানান। এভাবে পারস্পরিক তথ্য বিনিময়ে আপনার সন্তান সহজেই শিক্ষালাভ করতে পারবে।

ইউটিউবে শিখুন

ভিডিও শেয়ারিং সাইট ইউটিউব শুধু বিনোদনের বিষয় নয়। ইউটিউবে রয়েছে অসংখ্য শিক্ষামূলক ভিডিও। বহু মজার উপায়ে কঠিন সব সূত্র শিখতে চাইলে ইউটিউবে অনুসন্ধান করুন এবং আপনার সন্তানকে তা দেখান।

নিজেও শিখুন

শুধু সন্তানকে শিক্ষা দিলেই হবে না, নিজেও শিখে নিন। সন্তানের সঙ্গে নিজে পড়াশোনা করুন। এতে সে দারুণ উৎসাহিত হবে।

বিভিন্ন মাধ্যম একত্রিত করুন

আপনার সন্তানের শিক্ষার জন্য শুধু একটি বই যদি বারবার পড়তে হয় তাহলে তা একঘেয়ে হয়ে যাবে। তাই বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তথ্য একত্রিত করুন।

ধ্যান করুন

মেডিটেশন বা ধ্যান মনোযোগ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ভোরে এবং রাত্রে ঘুমানোর আগে ১০ মিনিট মেডিটেশন করলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ে। ফলে ধীরে ধীরে যে কোন বিষয়ে মনোনিবেশ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কিভাবে মেডিটেশন করবেন তা জানতে পড়ুন এই লেখাটি।

গেম খেলুন

যত বেশি আপনি মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখবেন গঠনমূলক কার্যক্রমে তত বেশি তার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এ ক্ষেত্রে ব্রেইন গেমগুলো খুবই কার্যকর (concentration exercises)। দাবা, সুডোকু, বিলিয়ার্ড, ক্রস ওয়ার্ড পাজল ইত্যাদি খেলাগুলো আপনার চিন্তা করার ক্ষমতা বাড়াবে এবং মনঃসংযোগ বৃদ্ধি করবে। এছাড়া মোবাইল বা কম্পিউটারে খেলার জন্যেও প্রচুর ব্রেইন গেম রয়েছে। তবে হ্যা! তারমানে এই না যে, আপনি সারাদিন গেম নিয়ে বসে থাকবেন মনোযোগ বৃদ্ধির জন্য! সবকিছুর একটা সীমাবদ্ধ থাকে, তাই আপনাকে নিয়ম-মাফিক বা পর্যাপ্তভাবে কাজ করতে হবে।

আরো পড়ুন: ড্রাগন ফল খেলে কি হয়? দেখুন ড্রাগন ফলের সেরা পুষ্টিগুণ সমূহ!

সঠিক স্থান বাছুন

শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন সব বিষয় শিশুর পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে। তাই পড়ার টেবিলটি এমন স্থানে বসান যেখানে রেডিও কিংবা টিভির মতো মনোযোগ নষ্ট করার উপাদান নেই।

উৎসাহ ও প্রশংসা

উৎসাহ ও প্রশংসার পেলে শিশু পড়ুয়াদের পড়াশোনায় আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই সর্বদা তাদের উৎসাহ দিতে ভুলবেন না। সামান্য উন্নতিতেই প্রশংসা করুন।

ছাড় দিন

পড়াশোনার জন্য যখন শিশু ব্যস্ত তখন অন্যান্য বিষয়গুলোতে ছাড় দিন। পরীক্ষা সারাবছর থাকবে না, এ বিষয়টি নিজে মানুন এবং তাকেও জানিয়ে দিন।

সময় ভাগ করুন

কোনো রুটিন ছাড়া পড়াশোনা করলে তা সঠিকভাবে কাজে নাও লাগতে পারে। আবার শিশুদের সঠিকভাবে রুটিন মেনে চলা কঠিনও হতে পারে। তাই শিশুর জন্য পড়ার সময় ভাগ করে দেওয়া উচিত আপনারই।

পুরো পরিবারকে সঙ্গে নিন

শিশুর পড়াশোনার সহায়তার জন্য পুরো পরিবারকেই এগিয়ে আসা উচিত। বাসার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পড়ার বিষয় টাঙ্গানো, ডিনার টেবিলে অংকের সূত্র লাগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি তাকে পড়াশোনায় এগিয়ে নিতে পারবে।

সামাজিক গণমাধ্যম দুরে রাখুন

কাজ শুরু করার আগে মনোযোগ নষ্ট করতে পারে এমন বিষয়গুলো দূরে রাখুন। কাজের গুরুত্ব বিবেচনা করে মোবাইল, টিভি ইত্যাদি বন্ধ রাখুন। পড়ার সময় এফ এম রেডিও এবং কম্পিউটার চালু রাখলে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়।

কিছু গবেষণায় দেখা যায়, কোন কাজ বা পড়ার সময় নিচু শব্দে হাল্কা যন্ত্রসঙ্গীত শুনলে তা মনোযোগ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। গুগলে আপনার টপিকস নিয়ে সার্চ করলেই পেয়ে যাবেন এমন অনেক যন্ত্রসঙ্গীত যা ব্যবহার করতে পারেন মনোযোগ বৃদ্ধি (increase concentration) করার উপায় হিসেবে। তবে গায়ক/গায়িকা পরিবেশন করছে এমন সঙ্গীত আপনাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করবে না!

ঘাম চাপান

গবেষণায় দেখা গেছে, কোন কাজ করার সময় চিউয়িং গাম চাবালে সে কাজে মনোযোগ দিতে সুবিধা হয়। তাই মনোযোগ বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করতে পারেন চিউয়িং গাম। তবে লক্ষ্য রাখবেন তা যেন অবশ্যই চিনি মুক্ত হয়।