শিশুকে মায়ের দুধ পানের বিশেষ কিছু কৌশল ও পরামর্শ

780

« এক নজরে দেখুন এই প্রতিবেদনে কি কি রয়েছে »

নতুন মায়েদের নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানোর কিছু নিয়ম-

শিশুকে কিন্তু সময় বেঁধে নয়, বারবার এবং যতবার শিশু চায়, ততবারই দুধ দিতে হবে। ধৈর্য ধরে খাওয়াতে হবে, খাওয়া শেষের  আগেই  সরিয়ে নেওয়া উচিত নয়। কারণ, বাচ্চা দুধ টানলে মায়ের মস্তিষ্কের  ভেতরের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে হরমোন নিঃসৃত হয়ে  বেশি বেশি দুধ তৈরির উদ্দীপনা জাগায় ।

বাচ্চা যত বেশি দুধ টানবে তত বেশি হরমোন নির্গত হবে আর তত বেশি  দুধ উৎপাদিত হবে। তাই  বুকের দুধ তৈরির একমাত্র উদ্দীপনা হলো শিশুর বুকের দুধ টানা। এ কারণেই  যে মায়েরা একেবারে শুরু  থেকেই বারবার বুকের দুধ দেননি, তাঁদের এই উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝেছেন  দুধ পাচ্ছে না বলে ফমুর্লা বা কৃত্রিম দুধ কিছুতেই দেওয়া যাবে  না, এতে মায়ের দুধ আরো কমে যাবে এবং শিশুর বুকের দুধ টানার অভ্যাসটাও চলে যাবে।


নবজাতক কিন্তু একবারে বেশি পরিমান খেতে পারে না। সেজন্য একবারে অনেকটা খাইয়ে পেট বেশি ভরিয়ে দিবেন না। অল্প অল্প করে বার বার খাওয়ানোই বাচ্চার জন্য আদর্শ।

-বাচ্চাকে খাওয়ানোর রুটিন করে নেবেন না। ওর যখন খিদে পাচ্ছে তখনই ওকে খেতে দিন। বাচ্চা যত বড় হতে থাকবে তত বেশি পরিমান খাবে আর খাওয়ার মাঝের ব্যবধানও বাড়বে। তাই নিজের সুবিধা মতো ওকে রুটিনে বাঁধবেন না।

-যেসব শিশুরা সময়ের আগেই জন্ম নেয় তারা অন্য শিশুদের তুলনায় কম খেতে পারে। অনেক সময় দেখা যায় এসব বাচ্চারা এত বেশি ঘুমায় যে খিদে পেলেও উঠতে চায় না। এজন্য বাচ্চা অনেকক্ষন না খেয়ে থাকলে ওকে কোলে নিয়ে হালকা ঝাঁকিয়ে আগে জাগিয়ে নিন,তারপর দুধ খাওয়ান। কারন বেশি সময় না খেয়ে থাকা শিশুর শরীরের জন্য ভালো নয় মোটেই।

-শিশুকে খাওয়ানোর সময় তাড়াহুড়ো করবেন না, হাতে সময় নিয়ে ধীরে ধীরে খাওয়ান।

-ছোট শিশুকে কখনও বিছানায় শুয়ে দুধ খাওয়ানো ঠিক নয়, এতে শিশুর শ্বাস নালীতে খাবার চলে যেতে পারে। তাই শিশুকে সব সময় কোলে নিয়ে বসে খাওয়ানো অভ্যাস করুন।

-খুব ছোট বাচ্চারা এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর পর খায়। তবে যেসব বাচ্চা মায়ের বুকের দুধ খায় তারা বোতলে দুধ খাওয়া বাচ্চার তুলনায় ঘন ঘন খাবে।

-বাচ্চাকে খাওয়ানোর পর অবশ্যই ঢেঁকুর তোলাতে হবে। না হলে বাচ্চা বমি করে দিতে পারে। বাচ্চাকে কাঁধের উপর রেখে বা কোলে বসিয়ে ধীরে ধীরে পিঠে নীচ থেকে উপর পর্যন্ত চাপড় দিতে থাকুন। এভাবে কিছুক্ষন করার পরই বাচ্চা ঢেঁকুর দিবে। ঢেঁকুর দেয়ার সময় মুখ দিয়ে সামান্য খাবার বেরিয়ে আসতে পারে,এতে চিন্তার কিছু নেই।

– শিশুকে খাওয়ানোর সময় কোলাহল পূর্ণ জায়গা থেকে সরে আসুন। নিরিবিলি পরিবেশে শিশুকে খাওয়ান।

– সমস্যা বোধ করলে খাওয়ানোর নিয়ম কানুন নিয়ে আপনার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নিন।


বুকের দুধ দেয়ার সময় আমি কেমন খাওয়া-দাওয়া করব? 

বুকের দুধ দেয়ার সময় আপনি যথাযথ খাদ্যাভ্যাস বজায় রেখে এবং ব্যায়াম করে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওজন কমাতে পারেন। প্রচুর খাওয়ার দরকার নেই। আপনার শরীরের চাহিদার প্রতি খেয়াল রাখুন এবং খিদে লাগলে খান। তবে স্বাস্থ্যকর খাবার খান। প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল, মাছ (সামুদ্রিক মাছ নয়), এবং উপকারি চর্বিযুক্ত খাবার খান। আপনার শিশু ঘন ঘন বুকের দুধ খেলেও আপনি বাড়তি ক্যালরির চাহিদা একটা কলা বা আপেল অথবা পিনাট বাটার দিয়ে এক স্লাইস রুটি খেয়েও মেটাতে পারেন।

প্রতিবার কতক্ষণ করে খাওয়ানো উচিত? 

প্রতিটি শিশুই আলাদা। কেউ কেউ অল্প করে বার বার খেতে চায় আবার কেউ কেউ অনেকক্ষণ ধরে খায়। শিশুকে প্রথমে একটি স্তনের দুধ খাইয়ে শেষ করুন, তারপর আরেকটি স্তন তার মুখে দিন। যদি বাচ্চা সারাক্ষণ খেতে থাকে এবং আপনার তাতে দুশ্চিন্তা হয়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। ৬ মাসের কম বয়সী শিশুর ২০-৪৫ মিনিট ধরে খাওয়ার কথা।

ব্রেস্টফিডিং পেইন

যারা প্রথম মা হয়েছেন তাদের ভিতরেই এই ব্যথাটা বেশী হয়। বাচ্চার মুখে স্তন দেয়ার সাথে সাথেই এই ব্যথা শুরু হয়।বাচ্চা দুধ খাওয়া শুরু করলেই ব্যথাটা টের পাওয়া যায়। এটা হয় নিপল এর চামড়া ড্রাই থাকলে। বা দুধের পরিমাণ বেশীথাকলেও এমন হয়।

বাচ্চা দুধ খাওয়া শুরু করার মিনিটের ভিতরেই ব্যথা দূর হয়ে যায়। এতে ভয়ের কিছুই নেই। তবে যদি এরপরেও ব্যথা দূর নাহয় তাহলে বাচ্চার মুখে একটি আঙুল ঢুকিয়ে স্তন বের করে নিয়ে আবার স্তন মুখে দিতে হবে। খেয়াল করতে হবেস্তনবৃন্তের (নিপলের পাশের কালো অংশকে স্তনবৃন্ত বলে) নীচের দিকটা যেন বাচ্চার মুখে বেশী থাকে উপরের অংশেরচেয়ে। টাইট কাপড় পড়া পরিহার করতে হবে। সাবান ব্যবহার করা যাবে না স্তনে। স্তনকে হাইড্রেট রাখতে ল্যানোলিনবেজড ক্রীম বা লোশন ব্যবহার করতে পারেন।

ক্র্যাকড নিপল

অনেক মায়ের দুধের নিপল ফেটে যায় যা থেকে এমনকি রক্ত পর্যন্ত বের হয়। স্তন্যপান করানোর সময় এই সমস্যাটাঅনেক কষ্টকর হয়। বিশেষ করে শিশু যখন দুধ খায় তখন প্রচন্ড জ্বালাপোড়া বোধ হয়। রক্ত বের হলে ব্যথার পরিমাণটাওঅসহনীয় হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রেও বুকে পরিমানে বেশী দুধ থাকাই কারণ সাধারণত। 

স্তন যথাসম্ভব মশ্চারাইজড রাখতে হবে। পরিষ্কার তো বটেই। শিশু দুশ খাওয়ার সময় যদি কিছু রক্ত তার মুখেও চলে যায়তাতে ক্ষতির কিছু নেই, এটা মনে রাখতে হবে। ব্যথার জন্য ব্যাথানাশক ওষুধ খাওয়া চলতে পারে এ সময়। ব্যথার কারণেদুধ না খাওয়ানোর সিধান্ত ভুল হবে। কারণ বেশী দুধ জমে গেলে তাতে ব্যথা বাড়বে। বাচ্চা দুধ খাওয়ার পর বুকের কিছু দুধনিপলে লাগিয়ে রাখলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। বুকের দুধেই এমন কিছু উপাদান আছে যা এই ফাটা সারিয়ে তুলতে পারে।এ ক্ষেত্রেও ল্যানোলিন বেজড ক্রীম লাগানো যাবে নিপলে। তবে বাচ্চার মুখে দুধ দেয়ার আগে সেটা হালকা গরম পানিতেকাপড় ভিজিয়ে মুছে নিতে হবে।

দুধ জমাট বাঁধা

 এ সমস্যায় ভোগেন না এমন মা খুব কম আছেন। ঠিকমতো দুধ বের হতে না পারলেই দুধ জমাটবেঁধে যায়। হালকা জ্বর আসা বুক ভারি হয়ে যাওয়া এর লক্ষন। এতে মায়ের স্তনে ব্যথাও হয়।বাচ্চাকে দুধ দিতে গিয়েও পড়তে হয় ঝামেলায়

দুধ যেন ঠিকমতো বের হতে পারে সেজন্য সতর্ক থাকতে হবে। বুকের দুধ খাওয়ানোর নিয়ম মেনেবাচ্চাকে দুধ দিতে হবে। হালকা গরম কাপড়ের সেক নিলে আরাম পাওয়া যাবে। হালকা ম্যাসাজকরলেও দুধের জমাট বাঁধা দূর হয়ে যায় অনেক সময়। কোনোভাবেই টাইট ব্রা পড়া যাবে না এসময়। তারপরও যদি জ্বর বাড়ে এবং স্তন জমাট বেঁধে ভারি হয়েই থাকে তাহলে ডাক্তারের সাথেপরামর্শ করাই উচিত।

অপ্রতুল দুধ

অনেক মায়ের স্তনে বাচ্চার জন্য দুধ পরিমানে কম থাকে অর্থাৎ বাচ্চা যত চেষ্টাই করুক না কেনবুকের দুধ তার মুখে কম যায়। দুধ না পেলে বাচ্চা চিৎকার করে কান্নাকাটি করে। এবং তার ক্ষুদাওমেটে না। 

বুকে দুধ কম থাকলে হাত দিয়ে দুধ পাম্প করার চেষ্টা করতে হবে। এটাই সবচেয়ে ভালো উপায়বুকে দুধ আনতে চাইলে। স্তনে দুধ এলে এভাবেই আসবে। প্রোটিন বা ক্যালোরির পরিমাণ বাড়িয়েদিলেই বুকে দুধ আসবে এমন না বিষয়টা। তবে অবশ্যই সুষম খাবার খেতে হবে বাচ্চাকে দুধখাওয়াতে চাইলে।

অধিক দুধ

অনেক মায়ের আবার প্রচুর দুধ থাকে স্তনে। একটি স্তন খাওয়ানোর সময় অন্য একটি থেকে দুধ পড়তে থাকে এমনটাওহয়। এতে করে অনেক সময় বাচ্চার চোখে নাকেও ছিটকে গিয়ে দুধ পড়তে পারে খেয়াল না করলে। মায়ের জন্য শরীরপরিষ্কার রাখা খুব জরুরী। এভাবে দুধ পড়লে শরীর স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে থাকে।

 হরমোনাল কারণে দুধ কম বেশী হতে পারে। তাই দুধ বেশী হলে এটা কমানোর চেষ্টা করার প্রয়োজন নেই। তবে দুধ ছিটকে যেন বাচ্চারচোখে নাকে না যায় সেজন্য প্রয়োজনে আগে কিছুটা দুধ একটু গড়িয়ে পড়তে দিতে হবে। প্রবল গতিতে দুধ যেন শিশুর গলায় গিয়ে নালাগে সেজন্য সতর্কতার সাথে শিশুকে স্তন্যপান করানোর পরামর্শই দিয়ে থাকেন শিশু বিশেষজ্ঞরা।

শিশুকে মায়ের দুধ পানে ইসলামের বিধান

জন্মের পর শিশুর জন্য সর্বোত্তম খাবার হলো মায়ের বুকের দুধ। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক নবজাতক শিশুর জন্য মায়ের বুকে দুধ সৃষ্টি করে রাখেন। যা হালকা মিষ্টি ও উষ্ণ; যা নবজাতক শিশুর নাজুক অবস্থার জন্য বিশেষ উপযোগী।

নবজাতক শিশুকে মায়ের বুকের দুধ পান করানোর প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘স্তন্যদানকারী ও গর্ভবর্তী মহিলা থেকে রমজানের রোজা রাখার বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। (আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসাঈ ও মিশকাত)

বর্তমান সময়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান শিশুকে মাতৃদুগ্ধ দানের ব্যাপারে যে গুরুত্বের কথা বলে, সে গুরুত্বের কথা ইসলাম আজ থেকে দেড় হাজার বছর পূর্বেই ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা কুরআনেই নবজাতক শিশুকে মায়ের বুকের দুধ পান করানোর ব্যাপারে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা বিধান ঘোষণা করেছেন।

আল্লাহ তাআলা সুরা লোকমানের ১৪নং আয়াতে বলেন, ‘আমি তো মানুষকে তার পিতামাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্ট স্বীকার করে গর্ভে ধারণ করে। অতঃপর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে।’

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করাবে। (সুরা বাক্বারা : আয়াত ২৩৩)

কুরআন ও হাদিসের আলোচনা থেকে বুঝা যায়-
শিশুকে বুকের দুধ পান করানোর সময়সীমা হল, জন্মের পর থেকে চন্দ্র মাসের হিসাব অনুযায়ী পূর্ণ দুই বছর। শিশুর প্রয়োজনে এ সময় আরো ছয় মাস বাড়ানো যেতে পারে।

আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেন, ‘তাকে গর্ভধারণ করতে ও দুধ ছাড়াতে লাগে ত্রিশ মাস। (সুরা আহকাফ : আয়াত ১৫)

মা ও শিশুর শারীরিক অসুস্থতার কথা বিবেচনা করে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে চিকিৎসা বিজ্ঞান নবজাতক শিশুকে মায়ের বুকের দুধ পান করানো থেকে বিরত থাকার কথাও বলা হয়েছে।

তাছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের দেহপসারিণী (ব্যভিচারী নারী) ও পাগল মহিলার দুধ পান করানো থেকে দূরে রাখ।’

শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সঠিক পদ্ধতি

শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য চা মাতৃদুগ্ধ। শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য দুধ পানের সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করা একান্ত দরকার। যেসব পদ্ধতি সমূহ অবলম্বন করা উচিত:

মায়ের আরামদায়ক অবস্থান

বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মাকে কোন আরামদায়ক স্থানে বসা উচিত। ঘরে যদি কোনো  সোফা-কুশন না থাকে, তবে কোনো চৌকি বা  ইজি চেয়ারে বসেও মা দুধ শিশুকে দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে পারেন। এছাড়া দেয়ালে বা বালিশে হেলান দিয়ে বসে অথবা শুয়ে বুকের দুধ খাওয়ানো যেতে পারে।যদি মা বসা অবস্থায় থাকেন, তাহলে  পিঠ সোজা রাখতে হবে, কাঁধ উঁচু করে রাখা যাবে না। মায়ের আরাম নিশ্চিত হলে এক ধরনের শিথিলতা আসে যাতে দুধ নিঃসরণে সুবিধা হয়।

বসে দুধ খাওয়ানোর সঠিক নিয়মঃ

মা যদি বসে শিশুকে দুধ খাওয়াতে চান, তাহলে মাকে সোজা হয়ে পিঠের পেছনে একটি বালিশ দিয়েবসলে ভালো হয় যাতে কোমর বাঁকা না হয় । হাতের নিচে একটি বালিশ দিলে হাত ঝুলে থাকবে না। যদি বালিশ পিছনে না রাখা হয়, তাহলে মা বেশিক্ষণ সঠিকভাবে বসে থাকতে পারবেন না, তাতে দুধ দেওয়াবাধা প্রাপ্ত হতে পারে। সব সময় লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে শিশু সম্পূর্ণ দুধ খেতে পারে। কারণ দুধ থেকে গেলে পরবর্তী দুধ জমতে বাধা প্রাপ্ত হয়।

দুধ খাওয়ানোর সময় শিশুকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রাখা

মা শিশুকে যে পদ্ধতিতে বা ভঙ্গিতে দুধ খাওয়ান না কেন, সবসময় খেয়াল রাখতে হবে যেন শিশুর দৃষ্টি মায়ের মুখের দিকে থাকে। শিশুর ঘাড় যেন গুঁজে না থাকে।  মায়ের দিকে শিশুকে এমনভাবে রাখতে হবে যেন স্তনের বোঁটার দিকে শিশুর মুখ থাকে। শিশুর মাথাটি থাকতে হবে মায়ের হাতের ভাঁজের উপর। শিশুর শরীর ও মায়ের বুকের মাঝে কোনো ফাঁক যেন না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। শিশুর শরীর যেন মায়ের বুকের সঙ্গে মিশে থাকে । শিশু সবসময় যেন মায়ের শরীরের  ঘনিষ্ঠ ছোঁয়া পায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে।  শিশু যদি খাওয়ার সময় ঘনিষ্ঠ ছোঁয়া পায়, তাহলে মা-শিশু দু-জনেরই খুব আরাম ও আনন্দ হয়। শিশু নিজেকে খুব নিরাপদ মনে করতে থাকে।

পর্যায় ক্রম অনুসরণ করা

দু’দিকের স্তন থেকেই শিশুকে পর্যায়ক্রমে দুধ খাওয়ানো দরকার। কোন কোন মায়েদের যে কোন একদিকের (ডান বা বাম) দুধ খাওয়াতে সুবিধা মনে হয়। তাই একদিকের দুধ বেশি খাওয়ান। অপরদিকে স্তন থেকে কম খাওয়ানোর ফলে সেটিতে দুধ তৈরি ও সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং শিশুটিও একদিকের দুধ খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে প্রতিবারে দু’দিকের স্তন থেকে দুধ খাওয়ানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে। একদিকের স্তন থেকে শিশুর পেট ভরে গেলে অপরটি পরবর্তী সময়ে খাওয়াতে হয়। শিশুর পেট ভরেছে কিনা বোঝার উপায় হলো : পেট ভরে গেলে শিশু আপনা আপনি দুধ খাওয়া ছেড়ে দেয়, তাছাড়া অপরবুকে দেয়ার পরেও শিশু আর খেতে চায় না।

শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সময় মায়ের পোশাক যেমন হওয়া উচিত

শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সময় মাকে তার পোশাকের ব্যাপারে বিশেষ দৃষ্টি রাখা উচিত। টাইট, ভারি পোশাক এড়িয়ে চলাই উচিত। এসময়টা শিশুকে বুকের দুধ খওয়ানোর বিষয়টা মাথায় রেখে মাকে হালকা, কম ঘাম হয়,আরামদায়ক কাপড় (যেমন: নাইট গাউন, বোতাম দেয়া শার্ট,সুতির গ্যাঞ্জি, নার্সিং ব্রা ইত্যাদি) পোশাক পড়া উচিত।  মায়ের এমন পোশাক পড়া উচিত নয় যাতে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে কষ্ট হয়। সামনে খোলা রাখা যায় এমন জামা পরলে দুধ খাওয়াতে মায়ের সুবিধা হয় সে কথা মাথায় রেখেই জামা কাপড় পছন্দ করা উচিত।

কর্মজীবী মায়েদের শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো:

কর্মজীবী মাকে সন্তান প্রসবের কিছুদিন পরেই কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে হয়। সেসব মায়েদের পক্ষে সময়মত বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো সম্ভব হয়ে উঠে না। তারা ব্রেস্ট পাম্পের সাহায্যে বুকের দুধ সংগ্রহ করে রাখতে পারেন। পরবর্তীতে বাড়ির অন্য কোন সদস্য ফিডারের সাহায্যে বাচ্চাকে সেই দুধ খাওয়াতে পারেন।এই দুধ ৬-৮ ঘণ্টা ভাল থাকে আর যদি ফ্রীজে রাখেন তবে ২৪ ঘণ্টা ভাল থাকবে। যদি বিশেষ সুবিধা থাকে তবে কর্মক্ষেত্রে শিশুকে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন। 

প্রচুর পানি পান করা

বাচ্চাকে বুকের খাওয়ালে মায়ের ডিহাইড্রেশন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য মাকে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩ লিটার পানি পান করা উচিত।এতে বুকের দুধের পরিমান বাড়ে এবং দুধের সরবরাহ নিয়মিত থাকে। এছাড়া ও মাকে পানি বা তরল জাতীয় জিনিস, ঝোল জাতীয় জিনিস, দুধ ইত্যাদি ও বেশি পরিমানে খেতে হবে। ফলে বাচ্চা অনায়াসে বুকে দুধ পাবে।

ঘড়ির দিকে না তাকিয়ে বাচ্চার দিকে নজর দিন

অসংখ্য  তথ্যের ভিড়ে আজকাল অনেক মা-ই ভুল করেন। অনেকেই মনে করেন যে ঘড়ি ধরে মেপে মেপে বাচ্চাকে দুধ খাওয়ালেই বাচ্চা ছোট বেলা থেকেই একটা নিয়মের মাঝে গেঁথে যাবে-যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ঘড়ির দিকে নজর না দিয়ে বাচ্চার সুবিধা-অসুবিধার প্রতি যত্নবান হন।সময় ও পরিস্থিতিই আপনার ও বাচ্চার জীবনের ছন্দ তৈরি করে দিবে।

ধৈর্য রাখুন

শিশু যদি মায়ের দুধ খেতে অনীহা দেখায় তবে জোরাজুরি করবেন না, নিরিবিলিতে শিশুকে নিয়ে বসে বাচ্চাকে গান শুনাতে শুনাতে মাথায় হাত বুলিয়ে খাওয়াতে চেষ্টা করুন।অনেক সময় মায়ের বুকে দুধ বেশি জমে গেলে স্তন ভারী হয়ে শক্ত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে চেপে দুধ বের করতে হবে এবং নরম হয়ে আসলে বাচ্চাকে দুধ দিতে চেষ্টা করতে হবে। এছাড়া ঠাণ্ডা বা গরম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে সেক নিলেও উপকার পাওয়া যাবে।

পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাবার

মায়ের পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাবার শিশুর পর্যাপ্ত বুকের দুধ পেতে সাহায্য করে। প্রচুর খাওয়ার দরকার নেই। আপনার শরীরের চাহিদার প্রতি খেয়াল রাখুন এবং খিদে লাগলে খান। তবে স্বাস্থ্যকর খাবার খান। প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল, মাছ (সামুদ্রিক মাছ নয়), এবং উপকারি চর্বিযুক্ত খাবার খান। আপনার শিশু ঘন ঘন বুকের দুধ খেলেও আপনি বাড়তি ক্যালরির চাহিদা একটা কলা বা আপেল অথবা পিনাট বাটার দিয়ে এক স্লাইস রুটি খেয়েও মেটাতে পারেন।


শিশুকে শুধুই বুকের দুধ খাওয়ানোর সঠিক পদ্ধতি

মায়ের আরামদায়ক অবস্থানমা আরাম করে, দেয়ালে বা বালিশে হেলান দিয়ে বসে অথবা শুয়ে বুকের দুধ খাওয়াবেন। বসা অবস্থায় পিঠ সোজা রাখবেন, কাঁধ উঁচু করে রাখবেন না

মা শিশুকে কোলে নেবার সময়

শিশুর বুক ও পেট মায়ের বুক ও পেটের সাথে লাগানো থাকবে

শিশুর মাথা, কান, কাঁধ একই সরলরেখায় থাকবে

শিশু মায়ের দিকে সম্পূর্ণ ফেরানো থাকবে

শিশুর ঘাড় মায়ের কনুইয়ের সামনের অংশে থাকবে এবং মাথা মুক্ত অবস্থায় থাকবে

মা শিশুকে কোলে নিয়ে বুকে লাগানোর সময়

স্তনের বোঁটা উপরের ঠোঁটে বারেবারে লাগাতে হবে

শিশু বড় করে হাঁ করলে তাকে স্তনের দিকে টেনে আনতে হবে

মায়ের কোলে শিশুর সঠিক অবস্থান

বোঁটা ও বোঁটার পেছনের কালো চামড়ার বেশির ভাগ শিশুর মুখের ভিতরে থাকবে

শিশুর নিচের ঠোঁট উল্টানো থাকবে

থুতনি ও নাক স্তনের সাথে লেগে থাকবে এবং গাল ফোলা ফোলা দেখাবে

মাঝে মাঝে দুধ গেলার শব্দ শোনা যাবে ও খাওয়া শেষ হলে বা পেট ভরে গেলে শিশু নিজে থেকেই মায়ের স্তন ছেড়ে দেবে বা ঘুমিয়ে পড়বে

কম ওজনের শিশুকে বুকের দুধ চেপে বের করে খাওয়ানো

কম ওজনের শিশু যদি মায়ের দুধ টেনে খেতে না পারে তবে দুধ চেপে বের করে খাওয়াতে হবে।

হাতের সাহায্যে মায়ের দুধ গেলে/চেপে বের করার পদ্ধতি

সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে, পরিষ্কার বড় মুখের একটি পাত্র নিয়ে বসতে হবে।

হাতের বুড়ো আঙুল স্তনের বোঁটার উপরে কালো ও সাদা চামড়ার সংযোগস্থলে এবং তর্জনি বোঁটার নিচে কালো ও সাদা চামড়ার সংযোগস্থলে রাখতে হবে, অন্যান্য আঙুল দিয়ে স্তনকে ধরে রাখতে হবে।

বুড়ো আঙুল ও তর্জনি দিয়ে বোঁটার পিছনের কালো ও সাদা চামড়ার সংযোগস্থলে চাপ দিতে হবে। পর্যায়ক্রমে হালকা ভাবে চাপতে ও চাড়তে হবে।কোনো ভাবেই জোরে চাপা যাবে না।

কালো চামড়ার চারপাশে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চাপতে হবে। আঙুল কিছুতেই চামড়াতে ঘষা যাবে না। এক স্তনে কম পক্ষে ৩-৫ মিনিট চাপতে হবে, অতঃপর অন্য স্তনে চাপতে হবে। এভাবে পুনরাবৃত্তি করতে হবে। বিশেষ করে প্রথমে কিছুদিন পর্যাপ্ত বুকের দুধ পেতে ২০-৩০ মিনিট ধরে চাপতে হবে।

চেপে বের করা দুধ শিশুকে খাওয়ানোর নিয়ম

চেপে বের করা দুধ অবশ্যই কাপে/চামচে করে শিশুকে খাওয়াবেন। বোতলে বা ফিডারে খাওয়ানো যাবেনা।

সাধারণ তাপমাত্রায় এই দুধ ৬-৮ ঘন্টা এবং ফ্রিজে ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত রাখা যায়।

শিশুকে খাওয়ানোর পূর্বে দুধের পাত্র ঝাঁকিয়ে নেবেন। কেননা দুধ কিছুক্ষণ রেখে দিলে উপরে চর্বি ভাসতে থাকে।