মাছের স্বাস্থ্য উপকারিতা; জেনে নিন কোন মাছের কি গুণাগুণ রয়েছে

0
319
মাছের পুষ্টিগুণ

মাছ আমাদের নিত্য দিনের খাবারের সঙ্গী। আমাদের খাবারের দ্বিতীয় তালিকাতে আছে মাছ। আমাদেরকে বলা হয় মাছে ভাতে বাঙ্গালী। কিন্তু আমরা তো প্রতিদিন একই জাতের মাছ খায় না। বিভিন্ন জাতের মাছ ভাতের সাথে খেয়ে থাকি।মাছ খাওয়ার উপকারিতা বলতে একেক মাছের আছে একেক গুন। সব মাছের পুষ্টিগুন সমান নয়।

মাছের কম ক্যালোরির জন্য একটি সুনাম রয়েছে, মাছের তেল ওমেগা ৩ ফ্যাটি এর একটি উৎস, যা ‘মস্তিস্ক খাদ্য’ নামে পরিচিত। ব্রিটেনে এক জরিপে দেখা যায়, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নারীরা ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড গ্রহণ করলে তাদের পেশীশক্তি প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। মাছের শতকরা ২০ ভাগই আমিষ। মাছে আছে প্রচুর ভিটামিন ও খনিজ লবণ এছাড়াও মাছে চর্বি, খনিজ তেল, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস পাওয়া যায়।

মাছ খেলে আমাদের শরীরে যে স্বাস্থ্য উপকার গুলো হয়

হার্টে ভালো রাখে

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ৫৪৯০০০ মহিলার উপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে যে সকল মহিলারা প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার মাছ তাদের যারা সপ্তাহে একবারও মাছ খান না তাদের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি হার্ট এটাকের ঝুঁকি রয়েছে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েসন সপ্তাহে দুবার মাছ খাওয়ার পক্ষে । বোস্টনের হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ এর এক গবেষণায় দেখা গেছে ,প্রতি সপ্তাহে মোটামুটি পরিমাণ মাছ খেলে হৃদরোগের কারণে মৃত্যুঝুকি ৩৬ শতাংশ কমে।

উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট এ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়

মাছের তেলে থাকা ওমেগা থ্রি নামক অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড যা রক্তের ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল LDL ও VLDL কমায় এবং উপকারী কোলেস্টেরল HDL বাড়িয়ে দেয়, ফলে হার্টেররক্তনালিতে চর্বি জমতেপারে না এবং রক্তনালি পরিষ্কার, সংকীর্ণমুক্ত থাকায় রক্ত চলাচল ভালো থাকে।উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমায় এবং উচ্চ রক্তচাপ থাকলে তা হ্রাস করে। গবেষণায়আরও দেখা গেছে, ওমেগা থ্রি রক্তের অণুচক্রিকাকে জমাট বাঁধতে দেয় না, ফলেরক্তনালিতে রক্ত জমাট বাঁধার কারণে সৃষ্ট স্ট্রোক হতে পারে না। সুতরাংহার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোক প্রতিরোধে আমাদের খাদ্য তালিকায় তৈলাক্ত মাছথাকা উচিত।

চুল উন্নত করে

চুলের গঠনের মূল উপাদান হলো প্রোটিন। তাই চুলপড়া রোধে আমিষজাতীয় খাবার সাহায্য করবে এটা খুবই স্বাভাবিক! আমিষের উত্স হিসেবে বিভিন্ন ধরনের মাছ অতুলনীয়! আমিষজাতীয় খাবারের মধ্যে মাংসও রয়েছে। তবে মাংসে উপকারী উপাদানের পাশাপাশি অপকারী উপদানের উপস্থিতিও রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে।

ত্বক ভালো রাখে

মাছের ওমেগো-৩ ত্বকের কোষের গঠন ঠিক করে, সানবার্ন থেকে ত্বককে রক্ষা করে। তা ছাড়া মাছের ফ্যাট ত্বকের জন্য হেলদি ফ্যাট, এই ফ্যাট ত্বকের জেল্লা বাড়ায় আর জল ও খাবারের পুষ্টি ত্বকের ভিতরে গিয়ে টক্সিন বের করে দেয়। তবে, বেশি ভাজা মাছে এই ফ্যাটের গুণ নষ্ট হয়ে যায়। তাই বেক বা গ্রিল করার মাছ অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর।

চোখ ভালো রাখে

মাছে থাকে উচ্চ মাত্রার ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড। এটা প্রমাণিত যে, ড্রাই আই সিনড্রোম প্রতিরোধে মাছ ভারি কার্যকর। প্রতিদিন মাছ খাওয়া খুবই ভালো। সেটা সম্ভব না হলে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন মাছ খেতে হবে নিয়ম করে। এতে করে চোখের দৃষ্টি শক্তিও ভালো থাকবে।

স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধি করে ও মস্তিষ্ক কর্মক্ষম রাখে

মাছ বাচ্চাদের ব্রেন উন্নত করে ও স্মৃতি শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। তাছাড়া, মাছের তেলে থাকা ডকসা হেক্সোনিক অ্যাসিড এবং এলকোসা পেন্টাএনোইক অ্যাসিড মগজের বিকাশ ঘটায়। অকল্যান্ডের একটি শিশু হাসপাতালে এই গবেষণাটি চালানো হয়। গবেষকেরা বলেন, আমাদের ত্বকে উৎপন্ন ভিটামিন ডি এবং সামুদ্রিক মাছ থেকে পাওয়া ওমেগা-থ্রি একত্রে মিলে মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই সেরোটোনিনই দেহের কর্মকাণ্ড এবং মস্তিষ্কের কর্মমতা বাড়ায়।

কিডনি ভালো রাখে

মাছকে বলা হয়ে থাকে নিরাপদ প্রোটিনের উৎস। দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে মাংসের চেয়ে মাছের ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের পাশাপাশি মাছের ওমেগা৩ কিডনির বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধকারী। নিয়োমিত মাছ খেলে কিডনি ভালো থাকে।

ক্যানসার প্রতিরোধ করে

সুইডেনের বিশেষজ্ঞদের গবেষণা অনুযায়ী, মাছ না খেলে ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ মাছ খাওয়া লোকদের চেয়ে দুই বা তিন গুণের বেশি । কিন্তু শুষ্ক মাছ সবসময় খেলে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে । শুধু টাটকা মাছ খেলে ক্যাসার প্রতিরোধ করা যায় ।

কোন মাছের কি গুণা গুণ জেনে নিন

১. রুই মাছ: বল বীর্য ও শুক্র বাড়ায় কিন্তু বাত রোগ থাকলে তা কমায়।

২. কাতলা মাছ: বায়ু পিত্ত ও কফ কমায় কিন্তু শক্তি বাড়ায়।

৩. বাউস মাছ: শুক্র ও বল বাড়ায়।

৪. চিতল মাছ: শুক্র ও বল বাড়ায়।

৫. ইলিশ মাছ: হজম শক্তি বাড়ায়, বায়ু কমায়, পিত্ত ও কফ কমায়।

৬. আইড় মাছ: শুক্র বল ও মেধা বাড়ায় কিন্তু বায়ু ও কফ কমায়।

৭. বোয়াল মাছ: শক্তি বাড়ায়, রক্ত ও পিত্তকে দুষিত করে কিন্তু ত্রিদোষ বাড়ায় অম্লপিত্ত কুষ্ট ও হাপানি প্রভৃতি কঠিন রোগ উৎপাদন করে। সব রোগীর জন্যই অপথ্য।

৮. মাগুর মাছ: শুক্র, বল ও রক্ত বাড়ায়, রক্তহীন ও পউরানা রুগীদের জন্য ভাল খাবার।

৯. শিং মাছ: কফ, মায়ের দুধ ও শক্তি বাড়ায় এবং শরীরের বাত কমায়।

১০. কৈ মাছ: শক্তি ও পিত্ত বাড়ায়, বায়ু কমায়।

আরো পড়ুন: সব সময় হাসি খুশি ও মন ভালো রাখার বৈজ্ঞানিক ২০টি মূলমন্ত্র!

১১. খলিশা মাছ: পায়খানা কষায়, বায়ু বাড়ায় গুলরোগ ও আমদোষ কমায়।

১২. শোল মাছ: পায়খানা কষায়, পিত্ত ও রক্তের জন্য খুবই উপকারী।

১৩. গজার মাছ: পায়খানা কষায়, শরীরে শক্তি বাড়ায়।

১৪. চিংড়ি মাছ: রুচি, বল, শুক্র ও কফ বাড়ায়। শরীরের মেদ পিত্ত ও রক্ত দোষে খুবই উপকারী। শীত পিত্ত বা শরীরে এলার্জি বৃদ্ধি করে।

১৫. চাপিলা: শুক্র, বল, কফ বাড়ায়। বায়ু ও পিত্ত কমে, শরীরে আমবাত হয়।

১৬. টেংরা মাছ : কফ ও পিত্ত কমায়, শরীরে বল বাড়ায়।

১৭. ভেটকি মাছ : শরীরের আমবাত উত্‍পন্ন করে, শ্লেমা বাড়ায়, বাত ও পিত্ত কমায়।

১৮. পুটি মাছ : শুক্র বাড়ায়, কফ, বাত, কুষ্ঠ রোগ দূর করে। ঘিয়ে ভাজা পুটি মাছে ধ্বজ ভঙ্গ রোগে উপকার হয়।

১৯. খলিশা মাছ : পায়খানা কষায়, বায়ু বাড়ায় গুলরোগ ও আমদোষ কমায়।

২০. শিলন মাছ : আমবাত উৎপন্ন করে, বল ও শ্লেমা বাড়ায়, বাত ও পিত্ত কমায়।

২১. বেলে মাছ : শরীরে বায়ু বাড়ায়।

২২. ফলি মাছ : শরীরে বল ও শুক্র বাড়ায়, বসন্ত প্রতিরোধক।

২৩. বাইন মাছ : শরীরে শক্তি ও শুক্র বাড়ায়, বাত পিত্ত থাকলে কমায়।

২৪. ভেটকি মাছ : শরীরের আমবাত উৎপন্ন করে, শ্লেমা বাড়ায়, বাত ও পিত্ত কমায়।

২৫. পুটি মাছ : শুক্র বাড়ায়, কফ, বাত, কুষ্ঠ রোগ দূর করে। ঘিয়ে ভাজা পুটি মাছে ধ্বজ ভঙ্গ রোগে উপকার হয়।

এছাড়া

মাছের ডিম : অত্যন্ত শুক্র বর্ধক, বল, পুষ্টি ও মেদ জনক।
মাছের তৈল : বল পুষ্টি ও কফ পিত্ত জনক।
শুটকী মাছ : মুখের রুচি বাড়ায়।

সতর্কতা

গর্ভাবস্থায় ক্ষতিকর

মাছে বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছে থাকা বিভিন্ন খনিজ উপাদান গর্ভাবস্থায় ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাঙ্গর, সোর্ডফিশ, টুনাসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছে অতিরিক্ত মাত্রায় পারদসহ অন্যান্য খনিজ উপাদান থাকে, যা দেহের জন্য ক্ষতিকর। এ ছাড়া বিশ্বের অনেক দেশেই প্রক্রিয়াজাত মাছ বিক্রি করা হয়। এই প্রক্রিয়াজাতকরণের কোনো ক্রুটির কারণে মাছ খাওয়া দেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

অতিরিক্ত মাছ খাওয়া

নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সামুদ্রিক মাছসহ বিভিন্ন স্বাদুপানির মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড থাকে। এই ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি খেলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এ বিষয়ে গবেষক নরম্যান হর্ড জানান, এই বিশেষ ফ্যাটি অ্যাসিডের প্রদাহবিরোধী ধর্ম রয়েছে। আর এ কারণে হার্টের স্বাস্থ্য ও প্রদাহজনিত সমস্যায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড উপকারী। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি অতিরিক্ত খেলে শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা পাল্টে যেতে পারে। এর ফলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে গিয়ে শরীর ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে, হতে পারে রোগ সংক্রমণ। ওই গবেষক বলেন, অতিরিক্ত ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের কারণে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা পাল্টে যায়, যা জীবাণুর সঙ্গে শরীরের লড়াই করার ক্ষমতার ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে। তাই পরিমিত পরিমাণে মাছ খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রতিদিনের আপডেট সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গেই থাকুন: প্রতিদিনের স্বাস্থ্য টিপস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here