ব্রেস্ট ক্যান্সারে কারন, লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায়

0
392
সম্ভব ডকটম
প্রতিকী ছবি

দৈনন্দিন জীবনে একটুখানি সচেতনতা আমাদের ব্রেস্ট ক্যন্সার বা স্তন ক্যান্সার এর হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। লজ্জা নয় বাচার তাগিদেই আপনাকে স্তন পরীক্ষা করতে হবে। স্তনের প্রতি যত্নবান হতে হবে।

স্তন ক্যান্সার কি?

স্তনের কিছু কোষ যখন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠে তখন স্তন ক্যান্সার হতে দেখা যায়। স্তন ক্যান্সারে আক্রান্তের মূলত দু ধরণের কারণ দেখা যায়।

প্রথমত, অপরিবর্তনযোগ্য কারণসমূহ এবং পরিবর্তনযোগ্য কারণসমূহ। অপরিবর্তনযোগ্য এই কারণে বলা হচ্ছে যে এই ঝুঁকিসমূহ জেনেটিক, বংশ এবং হরমোনের কারণে হয়ে থাকে। আর পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি সমূহ পুরোপুরি আমাদের নিজেদের হাতে থাকে। চলুন তবে এই স্তন ক্যান্সারে আক্রান্তের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।

ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার কারণ

জেনেটিক কিছু কারণে মানুষ স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। বিআরসিএ১, বিআরসিএ২ নামের জিনের মিউটেশন ৫% থেকে ১০% স্তন ক্যান্সারের জন্য দায়ী থাকে।  

বংশগত কারণে এই স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন অনেকেই। যেমন-মা, খালা, বোন বা মেয়ে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায় অনেকাংশে।  

মহিলাদের মাসিক শুরু এবং বন্ধের বয়সের ওপরেও এই রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি নির্ভর থাকে। যাদের ১২ বছর বয়সের পূর্বে মাসিক শুরু এবং ৫০ বছর বয়সের পর মাসিক বন্ধ হয় তাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।  

এস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাবে এই রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। যারা দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত এস্ট্রোজেন হরমোনের সংস্পর্শে থাকেন, মাসিক বন্ধ হওয়ার পর মহিলাদের মধ্যে যারা হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি গ্রহণ করেন, তাদের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।  

লিঙ্গভেদে ক্যান্সারে আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়ে। একজন নারী পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকেন।  

বয়স বাড়ার সাথে স্তন ক্যান্সারের আক্রান্তের সম্ভাবনা বাড়ে বিশেষ করে ৫০ বছর বয়সের পর এই ঝুঁকি অনেক বেশি বেড়ে যায়, যা পরিবর্তন যোগ্য নয় মোটেও।

অতিরিক্ত মদ্যপান মেয়েদের স্তন ক্যান্সারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। স্তন ক্যান্সারের হাত থেকে রক্ষা পেতে চান, তাহলে অবশ্যই মদ্যপান ত্যাগ করুন। অবিবাহিতা, সন্তানহীনা নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের প্রকোপ বেশি।

৩০ বছর বয়স পরে যারা প্রথম মা হয়েছেন, তাদের স্তন ক্যান্সারের প্রবণতা একজন কমবয়সী মা হওয়া নারীর থেকে অনেক বেশি। একইভাবে যারা সন্তানকে কখনো বুকের দুধ পান করাননি তাদের স্তন ক্যান্সার বেশি হয়।

অল্প বয়সে বাচ্চা নিলে, দেরিতে পিরিয়ড শুরু হলে, তাড়াতাড়ি পিরিয়ড বন্ধ হয়ে গেলে স্তন ক্যান্সারের প্রকোপ বেড়ে যায়। বয়স যত বাড়ে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি তত বৃদ্ধি পায়।

একাধারে অনেক দিন জন্ম নিরোধ পিল খেলেও স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অস্বাস্থ্যকর ডায়েট স্তন ক্যান্সারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।

স্তন ক্যান্সার লক্ষণ

কমবেশি সব মহিলাদের স্তনেই লাম্প থাকে। এর মধ্যে কয়েকটি ক্যানসারাস ও কয়েকটি নন-ক্যানসারাস। এই ব্রেস্ট লাম্পগুলি অনেক সময় আন্ডারআর্ম বা কলার বোনের তলাতেও দেখা যায়। এছাড়া স্তনবৃন্তের আশপাশেও এই ধরনের লাম্প থাকে যেগুলি টিপলে শক্ত লাগে এবং অবস্থান পরিবর্তন করে না। এমন কিছু দেখলে অবিলম্বে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

কোনও রকম র‌্যাশ নেই স্তনে, তবু ইচিং বা চুলকানির মতো অনুভূতি হচ্ছে, এমন কিছু কিন্তু ক্যানসারের লক্ষণ। অনেক সময় এর সঙ্গে নিপ্‌ল থেকে হালকা হালকা রস‌ নিঃসৃত হয়, স্তনের ত্বকেও কিছুটা পরিবর্তন আসে। তাই চুলকানির মতো কিছু হলে নিজে থেকে কোনও ক্রিম বা লোশন লাগাবেন না। আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলবেন।

স্তনে টিউমার থাকলে তা আশপাশের ব্রেস্ট টিস্যুগুলির উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং তার ফলে স্তনে একটা ফোলা ফোলা ভাব দেখা যায়। এরই সঙ্গে স্তনে লাল ভাবও থাকে। স্তনে হাত দিলে বা চাপ দিলে ব্যথাও লাগে।

কাঁধ এবং ঘাড়ের ব্যথাও ব্রেস্ট ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে কারণ এই ক্যানসার স্তন থেকে খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে শরীরের এই অংশগুলিতে। এই সমস্ত জায়গায় ব্যথা হলে সাধারণের পক্ষে জানা সম্ভব নয় তা মাস্‌ল পেইন নাকি ক্যানসারের কারণে ঘটছে। তাই পরীক্ষা করে নেওয়াই ভাল।

স্তনের আকার এবং সাইজ পরিবর্তনও এই ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে। সচরাচর এই বিষয়টি পার্টনারের চোখেই বেশি পড়ে। তেমন কিছু শুনলে বিষয়টি উড়িয়ে দেবেন না। নিজেই আয়নার সামনে স্তনটি পরীক্ষা করুন এবং ক্যানসারের পরীক্ষা করিয়ে নিন।

স্তনে লাম্প সব সময় বড় আকারের হয় না। ছোট ছোট ফুসকুড়ির মতো লাম্পও দেখা যায় স্তনবৃন্তের আশপাশে। অন্তর্বাস পরে থাকার সময় যদি ঘর্ষণ অনুভব করেন, বিছানায় শোওয়ার সময় যদি ব্যথা লাগে তবে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করবেন না।

ব্রেস্টফিডিং করছেন না অথচ স্তনবৃন্ত থেকে অল্প অল্প দুধের মতো জলীয় পদার্থ নিঃসরণ হচ্ছে এমনটা দেখলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে যাবেন। এটি ব্রেস্ট ক্যানসারের অন্যতম বড় লক্ষণ। অনেক সময় স্তনবৃন্ত থেকে রক্ত পড়তেও দেখা যায়।

স্তনবৃন্ত হল স্তনের অসম্ভব সংবেদনশীল অংশ। যদি দেখেন যে স্তনবৃন্ত স্পর্শ করলেও তেমন একটা অনুভূতি হচ্ছে না বা একেবারেই অনুভূতিহীন হয়ে গিয়েছে তবে তা ব্রেস্ট ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। স্তনবৃন্তের ত্বকের তলায় ছোট ছোট টিউমার তৈরি হলেই এমনটা হয়।

স্তনবৃন্ত চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া, বেঁকে যাওয়া বা স্তনবৃন্তের শেপ অসমান হয়ে যাওয়া ক্যানসারের লক্ষণ, বিশেষ করে যদি ব্রেস্টফিডিং না চলাকালীন অবস্থাতেও এই বিষয়গুলি চোখে পড়ে। সঙ্গীকে বলুন ভাল করে পর্যবেক্ষণ করতে। সামান্য সন্দেহ হলেই চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

স্তনের উপরের ত্বক খসখসে হয়ে যাওয়া, অনেকটা কমলালেবুর খোসার মতো, ক্যানসারের প্রাথমিক স্টেজের লক্ষণ। দিনের মধ্যে একটা সময় তাই ভালভাবে স্তনটি পর্যবেক্ষণ করা উচিত। যে কোনও লক্ষণ চোখে পড়লেই দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং পরীক্ষা করান।

ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধের উপায়

অনেক বেশি আঁশযুক্ত খাবার ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমাতে পারে। এর ফলে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ৫০% পর্যন্ত কমে। মটরশুঁটি, তাজা ফল, আস্ত শস্য এবং ফ্ল্যাভনয়েড, ক্রুসিফেরাস ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট(ব্রোকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপি) ও  ক্যারোটিনয়েড সমৃদ্ধ সবজি খান। পেঁয়াজ, রসুন, পেঁয়াজ পাতা ইত্যাদি সবজিগুলো ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ফ্রি র‍্যাডিকেলকে নিরপেক্ষ করে এবং ক্যান্সার কোষের বিভক্ত হওয়া প্রতিরোধ করে। এইধরনের সবজি কাঁচা খেলেই সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। সয়াবিন ও অন্য সয়া পণ্য যেমন- টফু ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। কিন্তু মিষ্টি স্বাদের ও রিফাইন্ড সয়া পণ্য যেমন- সয়া দুধ ও সয়া তেল এড়িয়ে চলুন। মনে রাখবেন চিনি ক্যান্সারের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। চিনি ক্যান্সার জিনকে সক্রিয় করে এবং ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিতে জ্বালানী হিসেবে কাজ করে।

শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন

যেসব নারীরা দৈনিক ৩০-৪৫ মিনিট ব্যায়াম করেন তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি যারা ব্যায়াম করেন না তাদের চেয়ে ২০-৪০% কমে যায়। তাই প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট সাধারণ ব্যায়াম যেমন- দ্রুত হাঁটার লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।

ওজন ঠিক রাখুন

গবেষণায় দেখা গেছে যে অধিক ওজন ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। ক্যান্সার ও ওজনের এই সম্পৃক্ততার জন্যই সবার উচিৎ দেহের স্বাভাবিক ওজন বজায় রাখা।

নিউট্রিশনাল সাপ্লিমেন্ট

অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে ব্রেস্ট ক্যান্সার ও অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ করা যায়। পর্যাপ্ত মাত্রার ভিটামিন এ, ডি ও ই ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রিনটি পান করুন

গ্রিনটিতে ইজিসিজি (এপিগ্যালোক্যাটেচিন-৩-গ্যালেট) নামক উপাদান থাকে যা ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিকে বন্ধ করতে সাহায্য করে। তাই প্রতিদিন গ্রিনটি পান করুন।

ভালো ফ্যাট গ্রহণ করুন

বিভিন্ন ধরণের চর্বি ব্রেস্ট ক্যান্সারের উপর প্রভাব বিস্তার করে। তাই খারাপ ফ্যাট বর্জন করে ভালো ফ্যাট গ্রহণ করা উচিৎ। ওমেগা৩ ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ খাবার যেমন- মাছের তেল খান এবং ওমেগা৬ ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ খাবার যেমন- ভুট্টা, সূর্যমুখীর তেল ইত্যাদি কম গ্রহণ করুন।

ধূমপান বর্জন করুন

যেসব নারীরা ধূমপান করেন বা ক্রমাগত পরোক্ষভাবে ধোঁয়ায় আক্রান্ত হন তাদের মধ্যে ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ৪০% এর ও বেশি। যাদের অ্যালকোহল সেবনের অভ্যাস আছে তাদের ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। যদি এই অভ্যাসগুলো আপনার থেকে থাকে তাহলে পরিত্যাগ করার চেষ্টা করুন।  

আরো পড়ুন: রসুনে ৪০টির ও বেশি উপকারিতা

টিপস

রাসায়নিক সমৃদ্ধ পরিষ্কারক, কীটনাশক ব্যবহার এড়িয়ে চলুন প্লাস্টিকের সামগ্রিতে খাদ্য ও পানি সংরক্ষণ বাদ দিন।

থ্যালেট ও প্যারাবেন সমৃদ্ধ বিউটিকেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহার বন্ধ করুন।

২০-৩৯ বছরের নারীদের প্রতি ৩ বছর পর পর স্তনের ডাক্তারি পরীক্ষা করানো উচিৎ।

৪০ ও তার অধিক বয়সের নারীদের প্রতিবছর স্তনের ডাক্তারি পরীক্ষা ও মেমোগ্রাম করানো উচিৎ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here