ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর ও ১০১টি সমাধান (২০১৯)

0
125
ডেঙ্গু
ডেঙ্গু

বাংলাদেশ ডেঙ্গু (ডেঙ্গি) জ্বরে কাঁপছে। ডেঙ্গু জ্বর মূলত এডিস এজিপ্টি (Aedes aegypti) মশার কামড়ে হয়। তবে সব মশার কামড়ে এ জ্বর হয় না। এই মশা তখনই ক্ষতিকর হবে যখন এই মশা ডেঙ্গু জ্বরে সংক্রমিত কোনো ব্যক্তিকে কামড় দেবে। ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাস তখন এই মশা বহন করবে এবং এই মশা যখন কোনো সুস্থ মানুষকে কামড় দেবে তখন ওই ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন।

বাংলাদেশে ব্যাপক আকারে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে ডেঙ্গুর কিছু প্রাকৃতিক সমাধানের কথা ছড়িয়ে পড়েছে – যার মধ্যে একটি হলো পেঁপে পাতার রস।

আরো পড়ুন: কিভাবে চিনবেন বিষাক্ত, দূষিত মাছ? ১ মিনিটে দেখে নিন!

ডেঙ্গু জ্বর কি

ডেঙ্গু জ্বরের উৎপত্তি ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা এবং এই ভাইরাস বাহিত এডিস ইজিপ্টাই নামক মশার কামড়ে। ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশা কোন ব্যক্তিকে কামড়ালে, সেই ব্যক্তি ৪ থেকে ৬ দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। এবার এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোন জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে, সেই মশাটিও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্যজনে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে।ডেঙ্গু প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে, ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু ফিভার এবং ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার।

আরো পড়ুন: গুগল সার্চের কিছু অবাক করা কান্ড! দেখে নিন ১৬টি ‘ইস্টার এগ’

ডেঙ্গু জ্বর কখন ও কাদের বেশি হয়?

ডেঙ্গু জ্বর কখন ও কাদের বেশি হয়?

মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, বিশেষ করে গরম এবং বর্ষার সময়টাতেই ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেশি থাকে। শীতকালে এই জ্বর হয় না বললেই চলে। শীতে লার্ভা অবস্থায় ডেঙ্গু মশা অনেক দিন বেঁচে থাকতে পারে। বর্ষার শুরুতেই সেগুলো থেকে নতুন করে ডেঙ্গু ভাইরাস বাহিত মশা বিস্তার লাভ করে।

সাধারণত শহর অঞ্চলে অভিজাত এলাকায়, বড় বড় দালান কোঠায় এই মশার প্রাদুর্ভাব বেশি, তাই ডেঙ্গু জ্বরও এই এলাকার বাসিন্দাদের বেশি হয়। বস্তিতে বা গ্রামে বসবাসরত লোকজনের ডেঙ্গু কম হয় বা একেবারেই হয় না বললেই চলে।

ডেঙ্গু ভাইরাস ৪ ধরনের হয়ে থাকে। তাই ডেঙ্গু জ্বরও ৪ বার হতে পারে। যারা আগেও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গু হলে তা মারাত্মক হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়।

ডেঙ্গু জ্বর কত দিন থাকে

ডেঙ্গু জ্বরের উৎপত্তি ডেঙ্গু ভাইরাসের দ্বারা এবং এই ভাইরাসবাহিত এডিস ইজিপ্টাই নামক মশার কামড়ে। ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশা কাউকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। এবার এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে সেই মশা ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্যজনে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে। ডেঙ্গু জ্বর আপনার সতর্কতা তা চিকিৎসার উপর করে ভিত্তি করে ভালো হয়ে যায়।

আরো পড়ুন: বিশ্বের সবছেয়ে বড় জাহাজ; টাইটানিক থেকে ১০গুণ বড়!

ডেঙ্গু রোগীকে কখন হাসপাতালে নেওয়া জরুরী

Dengu

ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। অবস্থা এমন যে হাসপাতালগুলো স্থান সংকুলান করতে হিমশিম খাচ্ছে। তবে ডেঙ্গু হলেই হাসপাতালে ছুটতে হবে, এমন নয়। অকারণে হাসপাতালে ভিড় করলে সংকটাপন্ন রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হতে পারে। কাজেই জেনে রাখা ভালো, রোগীকে কখন কেন হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।

ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা কামড়ানোর ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে রোগের সূচনা ঘটে। প্রচণ্ড জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখ ব্যথা, হাড় ও পেশিতে ব্যথা হয় এ সময়। অরুচি ও বমি বমি ভাবও হতে পারে। এবারের ডেঙ্গুতে ত্বকে র‌্যাশ বা দানা তেমন দেখা যাচ্ছে না। জ্বর হওয়া মাত্রই হাসপাতালে ছোটাছুটির দরকার নেই। তবে জ্বরের প্রথম তিন-চার দিনের মধ্যে রক্তের কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট ও ডেঙ্গু এনএস১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করানো উচিত।

ডেঙ্গু পজিটিভ হলে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রথম পাঁচ-ছয় দিন বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিতে পারেন। এ সময় প্রচুর পানি ও তরল পান করবেন, পুষ্টিকর খাবার খাবেন, বিশ্রাম নেবেন। তবে অনেক বমি হওয়া ও বমির জন্য কিছু খেতে না পারা, অস্থিরতা ও অস্বাভাবিক আচরণ, তীব্র পেট ব্যথা ইত্যাদির মতো উপসর্গ দেখা গেলে রোগীকে হাসপাতালে নিতে হতে পারে।

এ ছাড়া শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী, বয়োবৃদ্ধ, ডায়াবেটিস রোগ, হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ রয়েছে—এমন রোগীদের শুরু থেকেই হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে হতে পারে। এবার অনেকেই দ্বিতীয় বা তৃতীয় দফায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে এর তীব্রতা বেশি। পরে জ্বর সারতে না সারতেই অনেকে দ্রুত ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের জটিলতায় পড়ছেন। তাই জ্বর সেরে যাওয়ার সময় সতর্ক থাকতে হবে।

ডেঙ্গুর ক্রিটিক্যাল ফেজ বা জটিল অবস্থা শুরু হয় জ্বর সেরে যাওয়ার পর। কাজেই জ্বর কমার পরও সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকুন। চিকিৎসকের কাছ থেকে সতর্কসংকেতগুলো ভালো করে জেনে নিন।

সতর্ক সংকেতগুলো হলো : রক্তচাপ কমে যাওয়া, হাত-পা শীতল হয়ে আসা, চিকন ঘাম, অস্থিরতা ও অসংলগ্ন আচরণ, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুস বা পেটে পানি আসা এবং শরীরের যেকোনো স্থানে অস্বাভাবিক রক্তপাত।

আরেকটি লক্ষণ হলো প্লাটিলেটের সংখ্যা এক লাখের নিচে নেমে যাওয়া ও হিমাটোক্রিটের পরিবর্তন। এ ধরনের জটিলতায় রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া উচিত। ক্রিটিক্যাল ফেজ ৩৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কেটে যায়।

তবে কারও কারও ক্ষেত্রে অবস্থা আরও জটিল হতে পারে। শক সিনড্রোম হতে পারে, বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত সরবরাহ কমে মাল্টি অরগান ফেইলিউর (একাধিক অঙ্গ অকার্যকর) হতে পারে। আবার রক্তক্ষরণ, কিডনি বা হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা, যকৃতের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে রোগীকে।

যে ক্রিম মাখলে গায়ে ডেঙ্গু মশা বসবে না

ইতিমধ্যে দেশে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে একে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

ডেঙ্গুর এই অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিকে ভয়াবহ হিসেবে উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজ করছে সেটিকে পুরোপুরি মহামারী বলা না হলেও এর দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে। যেকোনো রোগ হওয়ার আগে তা প্রতিরোধ করতে হবে। কারণ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগে রোগ প্রতিরোধ ভালো।

এমন মুহূর্তে ডেঙ্গুজ্বরের ভাইরাস বহনকারী মশা তাড়ানোর ওষুধ বানানোর নিয়ম জানিয়েছেন ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি লেখক ও গবেষক রবিশঙ্কর মৈত্রী। ১৯ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মশা তাড়ানোর এই ওষুধ তৈরি পদ্ধতির কথা জানান তিনি। আসুন জেনে নেই কীভাবে ঘরেই তৈরি করবেন মশা তাড়ানোর ক্রিম।

মশা তাড়ানোর ক্রিম যেভাবে তৈরি করবেন

ছোট্ট একটি কৌটা বা কাচের বয়াম নিন। একটি মোমবাতি থেকে দুইশ গ্রাম মোম গুঁড়ো করে নিয়ে কৌটায় রাখুন।

এবার ৩০ মিলি নিম তেল এবং ৩০ মিলি গ্লিসারিন মিশিয়ে নিন। সঙ্গে ৫০ মিলি পানিও পাত্রে ঢেলে দিন। একটি গামলায় ১ লিটার পানি ১০ মিনিট ধরে গরম করুন।

গরম পানিতে নিম তেল, মোম ও পানিভর্তি পাত্রটি বসিয়ে রাখুন। লক্ষ্য করুন, পাত্রের মধ্যে মোম গলছে কি-না। যদি না গলে তাহলে গামলার পানি আরও একবার গরম করুন।

গরম পানির গামলা থেকে সাবধানে নিম, তেল, গ্লিসারিন, মোম আরও পানি মেশানো পাত্রটি তুলে এনে টেবিলে রাখুন।

৫-৭ মিনিট পর পাত্রের মধ্যে লেবুর রস ৫ ফোঁটা এবং যে কোন পারফিউম বা সুগন্ধি ৫ ফোঁটা ঢেলে দিন। এবার ছোট্ট একটি চামচ দিয়ে পাত্রের মিশ্রণটি ৫-৭ মিনিট নাড়তে থাকুন। তৈরি হয়ে যাবে মশা তাড়ানোর ক্রিম।

এই ক্রিমের গন্ধ একটু খরাপ হলেও ক্রিম হাতে পায়ে মেখে নিন। মশা আপনার কাছেও ঘেষবে না।

এই ক্রিম ফ্রিজে অথবা অপেক্ষাকৃত কম তাপমাত্রায় রাখতে হবে। তৈরির দিন থেকে ৬ মাস পর্যন্ত এ ক্রিম ব্যবহার করা যাবে।

আরো পড়ুন: ব্রণ, ত্বক, চুল ও আরো বিস্ময়কর স্বাস্থ্য উপকারী অ্যালোভেরায়!

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণগুলো কি কি

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণগুলো কি কি

ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণত তীব্র জ্বর ও সেই সঙ্গে সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়ে থাকে। জ্বর ১০৫ ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়ে থাকে। শরীরে বিশেষ করে হাড়, কোমড়, পিঠসহ অস্থি সন্ধি এবং মাংসপেশীতে তীব্র ব্যথা হয়। এছাড়া মাথাব্যথা ও চোখের পিছনে ব্যথা হয়। অনেক সময় ব্যথা এত তীব্র হয় যে মনে হয় বুঝি হাড় ভেঙ্গে যাচ্ছে। তাই এই জ্বরের আরেক নাম “ব্রেক বোন ফিভার”।

প্রচন্ড জ্বর, সর্বাঙ্গে বিশেষত হাড়ে ও গাঁটে গাঁটে ব্যথা, রক্তের প্লাটিলেট দ্রুত কমে যাওয়া, কালসিটেপড়া, শরীরের বিভিন্ন স্থান দিয়ে রক্ত পড়া এর উপসর্গ । গত বছর থেকে ডেঙ্গু জ্বরের নতুন একটি সমস্যা দেখা যাচ্ছে তা হল লিভার আক্রান্ত হওয়া, এতে রুগি দূর্বল বোধ করে, খেতে পারে না, বমি হয়, লিভার ব্যথা করে। এটি সাধারণত জ্বর কমে যাওয়ার পর পর দেখা দেয় এবং ৫-৭ দিন থাকতে পারে। 

জ্বর হওয়ার ৪ বা ৫ দিনের সময় সারা শরীরজুড়ে লালচে দানা দেখা যায়, যাকে বলা হয় স্কিন র‌্যাশ, অনেকটা এলার্জি বা ঘামাচির মতো। এর সঙ্গে বমি বমি ভাব, এমনকি বমি হতে পারে। রোগী অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ করে এবং রুচি কমে যায়। সাধারণত ৪ বা ৫ দিন জ্বর থাকার পর তা এমনিতেই চলে যায় এবং কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে এর ২ বা ৩ দিন পর আবার জ্বর আসে। একে “বাই ফেজিক ফিভার”বলে।

ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর

 শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত পড়া শুরু হয়, যেমন চামড়ার নিচে, নাক ও মুখ দিয়ে, মাড়ি ও দাঁত হতে, কফের সঙ্গে, রক্তবমি, পায়খানার সাথে তাজা রক্ত বা কালো পায়খানা, চোখের মধ্যে এবং চোখের বাহিরে, মহিলাদের বেলায় অসময়ে ঋতুস্রাব অথবা রক্তক্ষরণ শুরু হলে অনেকদিন পর্যন্ত রক্ত পড়তে থাকা ইত্যাদি।

এই রোগের বেলায় অনেক সময় বুকে পানি, পেটে পানি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। অনেক সময় লিভার আক্রান্ত হয়ে রোগীর জন্ডিস, কিডনীতে আক্রান্ত হয়ে রেনাল ফেইলিউর ইত্যাদি জটিলতা দেখা দিতে পারে।

আরো পড়ুন: চাকরি ‍খুঁজছেন? তাহলে এই ১১৫টি সাধারন জ্ঞান জেনে নিন!

ডেঙ্গু শক সিনড্রোম

ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহ রূপ হল ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের সাথে সার্কুলেটরী ফেইলিউর হয়ে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হয়। এর লক্ষণ হল-

 রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া।
নাড়ীর স্পন্দন অত্যন্ত ক্ষীণ ও দ্রুত হয়।
শরীরের হাত পা ও অন্যান্য অংশ ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
প্রস্রাব কমে যায়।
হঠাৎ করে রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বর হলেই কি চিন্তিত হবেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ বলছেন, এখন যেহেতু ডেঙ্গুর সময়, সে জন্য জ্বর হলে অবহেলা করা উচিত নয়। জ্বরে আক্রান্ত হলেই সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ বলছেন, ‘ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁরা জ্বরকে অবহেলা করেছেন। জ্বরের সঙ্গে যদি সর্দি-কাশি, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া কিংবা অন্য কোনো বিষয় জড়িত থাকে, তাহলে সেটি ডেঙ্গু না হয়ে অন্য কিছু হতে পারে। তবে জ্বর হলেই সচেতন থাকতে হবে।’

ডেঙ্গু জ্বর হলে করনীয়

ডেঙ্গু জ্বর হলে করনীয়

ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত এমনিতেই সাত দিনের মধ্যে সেরে যায়। এক্ষেত্রে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়। এ ছাড়া ডেঙ্গু জ্বরে প্রচুর পানি পান করতে হবে। প্রয়োজনে শিরাপথে স্যালাইন দিতে হবে। হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে সন্দেহ হলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রোগীর রক্তের প্লাটিলেট কাউন্ট এবং পিসিভি পরীক্ষা করাতে হবে।

হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বর রোগীর প্লাটিলেট কাউন্ট কমে যেতে পারে। প্লাটিলেট কাউন্ট কমে গেলে রোগীকে শিরাপথে প্লাটিলেট ট্র্রান্সফিউশন করতে হবে। আর যদি রোগীর প্রত্যক্ষ রক্তক্ষরণ থাকে যেমন—রক্তবমি, পায়খানার সঙ্গে কালো রঙের রক্ত যাওয়া, নাক দিয়ে প্রচুর পরিমাণে রক্তক্ষরণ হওয়া। তাহলে সে ক্ষেত্রে রোগীকে রক্ত দেওয়া যেতে পারে। ডেঙ্গু হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শে যত্নবান হতে হবে।

আরো পড়ুন: বাচ্ছাদের মনোযোগ বৃদ্ধির বৈজ্ঞানিক ১৫টি কৌশল!

ডেঙ্গু জ্বরের প্রাথমিক চিকিৎসা

ডেঙ্গু জ্বরের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তবে এই জ্বর সাধারণত নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। তাই উপসর্গ অনুযায়ী সাধারণ চিকিৎসাই যথেষ্ট। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়াই ভালো-

   প্রথমিক লক্ষণ:

শরীরের যে কোন অংশ থেকে রক্তপাত হলে।
    প্লাটিলেটের মাত্রা কমে গেলে।
    শ্বাসকষ্ট হলে বা পেট ফুলে পানি আসলে।
    প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে।
    জন্ডিস দেখা দিলে।
    অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দিলে।
    প্রচণ্ড পেটে ব্যথা বা বমি হলে।

ডেঙ্গু জ্বরে ভয়ের কিছু নেই। ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চললে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করা যায়।

আরো পড়ুন: কম্পিউটার কিবোর্ড শর্টকাট; কি-বোর্ডের ২০০টি শর্টকাট ব্যবহার

ডেঙ্গু জ্বরের খাবার

ডেঙ্গু জ্বরের খাবার

ডেঙ্গু জ্বরে রোগীরা কিছুই খেতে চায় না বা পারে না। শিশু ও বয়স্কদের এ সমস্যা বেশি হয় এবং রোগী ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পরে ও নানাবিধ জটিলতা দেখা দেয়। জ্বর হলে শরীরে ক্যালরির চাহিদা বাড়ে, ফলে বিপাক বেড়ে যায় ও রোগীর পুষ্টির দরকার হয়। রুচি কমে গেলে এমন খাবার বেছে নিন, যা অল্প খেলেও বেশি ক্যালরি পাওয়া যায়।

প্রচুর পরিমাণে তরলজাতীয় খাবার খেতে হবে। যেমন—ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস এবং খাবার স্যালাইন খেতে পারেন। এমন নয় যে প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে, পানিজাতীয় খাবার খেলেই হবে।

  • প্রচুর তরল পান করতে হয়, দিনে কমপক্ষে আড়াই লিটার।
  • পানির পাশাপাশি লবণ ও খনিজ উপাদানসমৃদ্ধ তরল যেমন ডাবের পানি, ওরস্যালাইন, লেবু-লবণের শবরত, ফলের রস পান করা উচিত।

  • এসব খাবার রক্তচাপ হ্রাসের ঝুঁকি কমবে।
  • অতি মিষ্টি পানীয় খেলে বমির উদ্রেক হতে পারে। তাই বাজারের কোমল পানীয় বা আইসক্রিম সহজে পিপাসা মেটায় না।

  • অরুচি বা বমি ডাবের জন্য তেল-মসলাযুক্ত খাবার, ফাস্টফুড ইত্যাদি না খাওয়াই ভালো। খাবারের তালিকায় পর্যাপ্ত শর্করা যেমন- ভাত, জাউভাত, ওটমিল ইত্যাদি রাখুন। প্রোটিন যেমন- দুধ, দই, মাছ বা মুরগির মাংস, স্যুপ রাখুন। অনেক ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর কিছু খেলেই বমি আসে। তারা হালকা শুকনো খাবার খাবেন। যেমন- বিস্কুট, মুড়ি ইত্যাদি। আদা-চা, গ্রিন-টি বা শুকনো আদা বমি ভাব কমায়। এ সময় ফল বেশি করে খেতে হবে।

আরো পড়ুন: সব উপদেশ শুধুমাত্র স্ত্রীর প্রতি কেনো?

ডেঙ্গু জ্বর এর চিকিৎসা

ডেঙ্গু জ্বর এর চিকিৎসা

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগী সাধারণত ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়, এমনকি কোনো চিকিৎসা না করালেও। তবে রোগীকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই চলতে হবে, যাতে ডেঙ্গু জনিত কোনো মারাত্মক জটিলতা না হয়। ডেঙ্গু জ্বরটা আসলে একটা গোলমেলে রোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হয়।

»»  সম্পূর্ণ ভালো না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রামে থাকতে হবে।

»»  যথেষ্ট পরিমাণে পানি, শরবত, ডাবের পানি ও অন্যান্য তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।

»»  খেতে না পারলে দরকার হলে শিরাপথে স্যালাইন দেওয়া যেতে পারে।

»» জ্বর কমানোর জন্য শুধুমাত্র প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধই যথেষ্ট। এসপিরিন বা ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ব্যথার ঔষধ কোনক্রমেই খাওয়া যাবে না। এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে।

»» জ্বর কমানোর জন্য ভেজা কাপড় দিয়ে গা মোছাতে হবে।
রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখুন।

»» প্রচুর পানি পান করতে দিন।

»» স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিতে কাপড় ভিজিয়ে শরীর বারবার মুছে দিন।

»» প্যারাসিটামল ট্যাবলেট খাওয়ানো যাবে।

»» ডাক্তারের পরামর্শে ব্যথানাশক ঔষধ দিন।

»» রোগীকে অ্যাসপিরিন বা এজাতীয় ঔষধ দিবেন না।

ডেঙ্গু জ্বর মোকাবিলায় ঘরের পরিবেশ স্বাস্থ্যকর রাখবেন যেভাব

ডেঙ্গু জ্বর মোকাবিলায় ঘরের পরিবেশ স্বাস্থ্যকর রাখবেন যেভাব

নিয়মিত ঘরের ধুলোবালি পরিষ্কার করুন 

ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে যত কথা হচ্ছে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় ততটুকু উদ্যোগ কি আমরা নিচ্ছি? এই যেমন নিজের ঘরটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর রাখা। যেন মশা না জন্ম নিতে পারে। 

ব্যক্তি-পর্যায়ের সচেতনতা ছাড়া ডেঙ্গুর সফল মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব। আপনি হয়ত অনেক সময় নিয়ে অনেক টাকা খরচ করে আপনার বাড়িটি সাজিয়েছেন। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালেই জন্ম নিতে পারে এডিস মশা। 

ঘুরে-ফিরে সব ঘরে গেলেও বাড়িতে আমাদের বেশি সময় বেডরুমেই কাটে। তাই শোবার ঘরের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখতে যা করতে হবে: 

•    শুধু মেঝে ঝাঁড়ু দেওয়াই নয় নিয়মিত ধুলোবালি পরিষ্কার করুন 
•    দরজা-জানলার পর্দা মাধে মাঝে ধুয়ে শুকিয়ে আয়রন করে আবার লাগান 
•    জানালা বা বারান্দার গ্রিলও পরিষ্কার রাখুন 
•    সপ্তাহে অন্তত দু’বার ড্রেসিং টেবিল, আলমারি ও টেবিলসহ সব ফার্নিচারের ওপরে-নিচে ও পেছনের জায়গাগুলো কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করুন
•    সপ্তাহে একবার করে বিছানার চাদর ও বালিশের কভার পাল্টে দিন
•    ঘরের বিভিন্ন স্থানে কিছু নিম পাতা রেখে দিন 
•    নিয়মিত ফ্লোর ক্লিনার দিয়ে মেঝে পরিষ্কার করুন 
•    ঘরে কোথাও কাপড় স্তুপ করে রাখবেন না, এখনেও মশা লুকিয়ে থাকতে পারে 
•    আর গাছের পানি অবশ্যই চেক করুন, ডেঙ্গু মশা কিন্তু পরিষ্কার পানিতেই থাকে। 

ডেঙ্গু জ্বর হলে যেসব ওষুধ খাওয়া উচিত নয়

অধ্যাপক তাহমিনা বলেন, ‘ডেঙ্গু জ্বর হলে প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে। স্বাভাবিক ওজনের একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন সর্বোচ্চ চারটি প্যারাসিটামল খেতে পারবে।’

চিকিৎসকরা বলছেন, প্যারাসিটামলের সর্বোচ্চ ডোজ হচ্ছে প্রতিদিন চার গ্রাম। কিন্তু কোনো ব্যক্তির যদি লিভার, হার্ট ও কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা থাকে, তাহলে প্যারাসিটামল সেবনের আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে গায়ে ব্যথার জন্য অ্যাসপিরিন-জাতীয় ওষুধ খাওয়া যাবে না। ডেঙ্গুর সময় অ্যাসপিরিন-জাতীয় ওষুধ খেলে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

আরো পড়ুন: তিন নাম্বার এক্স-গার্লফ্রেন্ড যখন পাত্রী

ডেঙ্গু জ্বরের ওষুধ কি

ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে অনেকে অনেক ধরণের চিকিৎসা বা তার সমাধান দিয়ে যাচ্ছেন। তার মধ্যে বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে ডেঙ্গু জ্বরে ওষুধ হিসাবে পেঁপেঁ পাতা আর নারিকেল তেল নিয়ে যে সমালোচনা হচ্ছে তার একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। লিখাটি: ডেঙ্গু জ্বর: পেঁপে পাতার রস বা নারিকেল তেল কি আসলেই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে কার্যকর?

প্লাটিলেট বা রক্তকণিকা নিয়ে চিন্তিত?

ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রে প্লাটিলেট বা রক্তকণিকা এখন আর মূল ফ্যাক্টর নয় বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক তাহমিনা।

তিনি বলেন, ‘প্লাটিলেট কাউন্ট নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বিষয়টি চিকিৎসকের ওপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো।’

সাধারণত একজন মানুষের রক্তে প্লাটিলেট কাউন্ট থাকে দেড়-লাখ থেকে সাড়ে চার-লাখ পর্যন্ত।

আরো পড়ুন: বর্ডার ক্রস বাইক কেনার আগে মোটরসাইকেল সকল টিপস পড়ুন

ডেঙ্গু জ্বর হলেই কি হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়?

ডেঙ্গু জ্বরের তিনটি ভাগ রয়েছে।
এ ভাগগুলো হচ্ছে—‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’।

প্রথম ক্যাটাগরির রোগীরা স্বাভাবিক থাকে। তাদের শুধু জ্বর থাকে। অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগী ‘এ’ ক্যাটাগরির।

তাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। ‘বি’ ক্যাটাগরির ডেঙ্গু রোগীদের সবই স্বাভাবিক থাকে, কিন্তু শরীরে কিছু লক্ষণ দেখা যায়। যেমন : তার পেটে ব্যথা হতে পারে, বমি হতে পারে প্রচুর কিংবা সে কিছুই খেতে পারছে না। অনেক সময় দেখা যায়, দুদিন জ্বরের পরে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে হাসপাতাল ভর্তি হওয়াই ভালো।

‘সি’ ক্যাটাগরির ডেঙ্গু জ্বর সবচেয়ে খারাপ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউর প্রয়োজন হতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বরের সময়কাল

সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ থাকে। কারণ, এ সময়টিতে এডিস মশার বিস্তার ঘটে। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে ডেঙ্গু জ্বরের সময়কাল আরো এগিয়ে এসেছে। এখন জুন মাস থেকেই ডেঙ্গু জ্বরের সময় শুরু হয়ে যাচ্ছে।

আরো পড়ুন: তুলসী পাতার গুনাগুন উপকারিতা ও ৬১ টি স্বাস্থ্য টিপস

এডিস মশা কখন কামড়ায়

অ্যাডিস মশা মূলত দিনের বেলা, সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায়, তবে রাত্রে উজ্জ্বল আলোতেও কামড়াতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বরের জন্য দায়ী এডিস মশা অন্ধকারে কামড়ায় না। সাধারণত সকালের দিকে এবং সন্ধ্যার কিছু আগে এডিস মশা তৎপর হয়ে ওঠে। এডিস মশা কখনো অন্ধকারে কামড়ায় না।

পানি জমিয়ে না রাখা

অধ্যাপক আবদুল্লাহ বলছেন, এডিস মশা ‘ভদ্র মশা’ হিসেবে পরিচিত। এসব মশা সুন্দর সুন্দর ঘরবাড়িতে বাস করে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এডিস মশা সাধারণত ডিম পাড়ে স্বচ্ছ পানিতে। কোথাও যাতে পানি তিন থেকে পাঁচ দিনের বেশি জমা না থাকে।

এ পানি যেকোনো জায়গায় জমতে পারে। বাড়ির ছাদে কিংবা বারান্দার ফুলের টবে, নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন পয়েন্টে, রাস্তার পাশে পড়ে থাকা টায়ার কিংবা অন্যান্য পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে।

আরো পড়ুন: গল্পঃ অন্তহীন ভালোবাসা

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার

বসতবাড়ির মশা নিধন: যেহেতু অ্যাডিস মশা মূলত এমন বস্তুর মধ্যে ডিম পাড়ে যেখানে স্বচ্ছ পানি জমে থাকে, তাই ফুলদানি, অব্যবহূত কৌটা, বাড়িঘরে এবং আশপাশে যে কোনো পাত্র বা জায়গায় জমে থাকা পানি তিন থেকে পাঁচ দিন পরপর ফেলে দিলে অ্যাডিস মশার লার্ভা মারা যায়। পাত্রের গায়ে লেগে থাকা মশার ডিম অপসারণে পাত্রটি ঘষে পরিষ্কার করলে ভালো ।

ঘরের বাথরুমে কোথাও জমানো পানি পাঁচ দিনের বেশি যেন না থাকে। একুরিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ার কন্ডিশনারের নিচে এবং মুখ খোলা পানির ট্যাংকে যেন পানি জমে না থাকে সে ব্যবস্থা করতে হবে। বাড়ির ছাদে অনেককে বাগান করতে দেখা যায়, সেখানে টবে বা পাত্রে যেন জমা পানি পাঁচ দিনের বেশি না থাকে, সেদিকেও যত্নবান হতে হবে। বাড়ির আশপাশের েঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

ডেঙ্গু জ্বর ও তার প্রতিকার

ডেঙ্গু জ্বর ও তার প্রতিকার

ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের মূল মন্ত্রই হল এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা। মনে রাখতে হবে, এডিস একটি ভদ্র মশা, অভিজাত এলাকায় বড় বড় সুন্দর সুন্দর দালান কোঠায় এরা বাস করে। স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে এই মশা ডিম পাড়ে। ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেনের পানি এদের পছন্দসই নয়। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একই সাথে মশক নিধনের জন্য প্রযোজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

অ্যাডিস মশা মূলত দিনের বেলা, সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায়, তবে রাত্রে উজ্জ্বল আলোতেও কামড়াতে পারে।

সতর্ক হোন, আতঙ্কিত হবেন না। আতঙ্কিত হলে করণীয় কাজটি ভুল হয়ে যাবে। ডেঙ্গুর শারীরিক লক্ষণ নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। লক্ষণ মিলিয়ে আসলে জ্বর আসে না সব সময়। এই আউটব্রেকের মৌসুমে জ্বর এলেই, মানে জ্বরের প্রথম দিনেই ডাক্তারের কাছে যাবেন। সিবিসি ও ডেঙ্গু এনএসওয়ান পরীক্ষা করবেন।

ডেঙ্গু এনএসওয়ান এক থেকে তিন দিনের ভেতর পজিটিভ থাকে। এর সেনসিটিভিটি ৬৬ থেকে ৭০ ভাগ। ৩০ ভাগ ডেঙ্গু হবার পরও নেগেটিভ দেখাতে পারে। তাই চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব দিন।

আরো পড়ুন: কনডম ক্রয়ের আগে যে জিনিসগুলো জানা খুবই জরুরী!

দিনের বেলা যথাসম্ভব শরীর ভালোভাবে কাপড়ে ঢেকে রাখতে হবে, প্রয়োজনে মোজা ব্যবহার করা উচিত। মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য দিনে ও রাতে মশারি ব্যবহার করতে হবে। দরজা-জানালায় নেট লাগাতে হবে।

প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলেন্ট, স্প্রে, লোশন বা ক্রিম, কয়েল, ম্যাট ব্যবহার করা যেতে পারে।

বাচ্চাদের হাফপ্যান্টের বদলে ফুলপ্যান্ট বা পায়জামা পরাতে হবে।

বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

ডেঙ্গু হলেই শিরায় স্যালাইন দিতেই হবে এমন নয়। মুখে আড়াই থেকে তিন লিটার পানি বা খাবার স্যালাইন খেতে পারলে শিরায় না দিলেও চলবে। তবে শক সিনড্রমের হিসাব আলাদা। বমি, পাতলা পায়খানা হলেও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ মতে তখন শিরায় স্যালাইন নিতে হতে পারে।

ডেঙ্গু হলেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে তাও না। প্রাইমারি কেয়ার সেন্টার বা আপনার নিয়মিত চিকিৎসকের চেম্বারে গেলেই চলবে। তিনি রক্তের রিপোর্ট, শারীরিক পরীক্ষা, ব্লাড প্রেসার, পালস ইত্যাদি পরীক্ষা করে তবেই সিদ্ধান্ত দেবেন ভর্তি হবেন কি হবেন না। নিজে নিজে হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য চেষ্টা করবেন না।

আরো পড়ুন: ব্রেস্ট ক্যান্সারে কারন, লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায়

‘প্লাটিলেট কমে গিয়ে রক্তক্ষরণ হয়ে রোগী শকে চলে যায়’ এ রকম প্রচারণায় বিশ্বাস করবেন না। ফেসবুকে যা দেখবেন তাই বিশ্বাস করবেন না। অমুক প্রফেসর বলেছেন বলে যেগুলো প্রচার হচ্ছে সেগুলোও না।

প্লাটিলেট নিয়ে অযথা ভীত হবেন না। প্লাটিলেট কাউন্ট ডেঙ্গুর প্রাথমিক ধারণা করতে সহায়তা করে। এর বেশি কিছু নয়। প্লাটিলেট ভালো থাকা বা খারাপ থাকা দিয়ে রোগীর ভালো-মন্দ বা রোগের তীব্রতা নির্ধারণ করা যায় না। ডেঙ্গু শক সিনড্রম একদম ভিন্ন জিনিস। প্লাটিলেট কম-বেশির সঙ্গে এর তেমন সম্পর্ক নেই।

ডেঙ্গুর প্লাটিলেট শরীরে দেওয়া খুব প্রচলিত ট্রেন্ড হলেও আসলে খুব কম ক্ষেত্রেই এটি লাগে। দিলেও কাজে লাগে কি না সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এ ব্যপারে ডাক্তারকেই সিদ্ধান্ত নিতে দিন। প্রভাবিত করবেন না। প্লাটিলেট কমে গেলেই আতঙ্কিত হয়ে এটি দিচ্ছেন না কেন বলে পীড়াপীড়ি করবেন না। প্রেসার,পালস, হিমাটোক্রিট বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম খুব জটিল একটি পর্যায়। আইসিইউতে ম্যানেজ করা উচিত। লিভার, কিডনি, হার্ট, ফুসফুস সব দিকেই সমস্যা হতে পারে। সব কিছু পরীক্ষা করে মনিটর করতে হয়। হিসেব করে শিরায় ফ্লুইড দিতে হবে। তারপরও কেউ কেউ মারা যেতে পারে। এটা মাথায় রাখতে হবে।

 যেহেতু এডিস মশা মূলত এমন বস্তুর মধ্যে ডিম পাড়ে যেখানে স্বচ্ছ পানি জমে থাকে, তাই ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে হবে। ব্যবহৃত জিনিস যেমন মুখ খোলা পানির ট্যাংক, ফুলের টব ইত্যাদিতে যেন পানি জমে না থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।

 ঘরের বাথরুমে কোথাও জমানো পানি ৫ দিনের বেশি যেন না থাকে। একুরিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ার কন্ডিশনারের নিচেও যেন পানি জমে না থাকে।

    এডিস মশা সাধারণত সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায়। তবে অন্য সময়ও কামড়াতে পারে। তাই দিনের বেলা শরীর ভালোভাবে কাপড়ে ঢেকে বের হতে হবে, প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের চারদিকে দরজা জানালায় নেট লাগাতে হবে।

    দিনে ঘুমালে মশারি টাঙিয়ে অথবা কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমাতে হবে।

    বাচ্চাদের যারা স্কুলে যায়, তাদের হাফপ্যান্ট না পরিয়ে ফুল প্যান্ট বা পায়জামা পরিয়ে স্কুলে পাঠাতে হবে।

আরো পড়ুন: দৃষ্টিশক্তি এবং মনোযোগ বৃদ্ধির ৩০টি অসাধারণ টিপস

    ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই সব সময় মশারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে করে রোগীকে কোন মশা কামড়াতে না পারে। মশক নিধনের জন্য স্প্রে, কয়েল, ম্যাট ব্যবহারের সাথে সাথে মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য দিনে ও রাতে মশারী ব্যবহার করতে হবে।

বসতবাড়ির বাইরে মশার বংশ বিস্তার রোধ: এই কাজগুলোর দায়িত্ব বর্তায় প্রশাসনে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের।

ঘরের বাইরে মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হওয়ার ফলে পানি জমতে পারে। যেমন: ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম, মাটির পাত্র, টিনের কৌটা, ডাবের খোসা, কন্টেইনার, মটকা, ব্যাটারির শেল, পলিথিন/চিপসের প্যাকেট। এসব জায়গায় জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে হবে।

মশা নিধনের জন্য স্প্রে বা ফগিং করতে হবে।

বিভিন্ন রাস্তার আইল্যান্ডে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ফুলের টব, গাছপালা, জলাধার ইত্যাদি দেখা যায়। এখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে পারে। সেগুলোতেও যেন পানি জমে না থাকে, সে ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে।

 ডেঙ্গু জ্বর হয়ত বা নির্মূল করা যাবে না। এর কোন ভ্যাক্সিনও বের হয় নাই, কোন কার্যকরী ঔষধও আবিস্কৃত হয় নাই। ডেঙ্গু জ্বরের মশাটি আমাদের দেশে আগেও ছিল, এখনও আছে, মশা প্রজননের এবং বংশবৃদ্ধির পরিবেশও আছে। তাই ডেঙ্গু জ্বর ভবিষ্যতেও থাকবে। একমাত্র সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমেই এর হাত থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।

লেখক: কাজী তানজিনা, ডা: রাহুল কবীর, ফারজানা লিমা, এ.জামাল।

Source: bbc, cdc, wikipedia, wikihow, worldhealth, WHO, Times of india, prothom-alo, ntv, jugantor etc..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here