জাম্বুরার পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা

587
সম্ভব ডটকম
সম্ভব ডটকম

জাম্বুরা বিভিন্ন নামে পরিচিত বাংলাদেশে। এই জাম্বুরাকে এক এক অঞ্চলে এক এক নামে বলা হয়। যেমন-জাম্বুরা, বাতাবি লেবু, বাদামি লেবু, ছোলম, বড় লেবু ইত্যাদি। জাম্বুরাতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি। লেবু যত প্রকারের আছে তন্মধ্যে এই জাম্বুরা হচ্ছে সর্বাপেক্ষা পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ।

বাংলাদেশ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ফারাহ মাসুদা তিনি জানান প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যযোগ্য জাম্বুরায় রয়েছে;

খাদ্যশক্তি ৩৮ কিলোক্যালরি।
প্রোটিন ০.৫ গ্রাম।
স্নেহ ০.৩ গ্রাম।
শর্করা ৮.৫ গ্রাম।
খাদ্যআঁশ ১ গ্রাম।
থায়ামিন ০.০৩৪ মিলি গ্রাম।
খনিজ লবণ ০.২০ গ্রাম।
রিবোফ্লেভিন ০.০২৭ মিলি গ্রাম।
নিয়াসিন ০.২২ মিলি গ্রাম।
ভিটামিন বি২ ০.০৪ মিলি গ্রাম।
ক্যারোটিন ১২০ মাইক্রো গ্রাম।
আয়রন ০.২ মিলি গ্রাম।
ক্যালসিয়াম ৩৭ মিলি গ্রাম।
ভিটামিন বি৬ ০.০৩৬ মিলি গ্রাম।
ভিটামিন সি ১০৫ মিলি গ্রাম।
ম্যাগনেসিয়াম ৬ মিলিগ্রাম।
ম্যাংগানিজ ০.০১৭ মিলিগ্রাম।
ফসফরাস ১৭ মিলিগ্রাম।
পটাশিয়াম ২১৬ মিলিগ্রাম।
সোডিয়াম ১ মিলিগ্রাম।

ঔষধি গুণ

জাম্বুরা শরীরে মেটাবলজম বাড়িয়ে দেয়, ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। এতে রয়েছে এমন কিছু এনজাইম, যা ফ্যাট পুড়িয়ে ফেলতে সাহায্য করে। ক্যালিফোর্নিয়ার নিউট্রিশন এন্ড ম্যাটাবলিজম সেন্টারের এক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, শুধু খাবার গ্রহণের ৩০ মিনিট আগে এক গ্লাস জাম্বুরার জুস খেয়ে ১২ সপ্তাহে ওজন কমানো সম্ভব দুই থেকে পাঁচ কেজি পর্যন্ত।

ওজন কমাতে সহায়ক

যারা ওজন কমাতে চান তাদের জন্য জাম্বুরা একটি জনপ্রিয় খাবার। সুস্বাদু, জাম্বুরা, ক্যালোরি খুব কম, প্রতি ১০০ গ্রাম জাম্বুরায় মাত্র ৪২ ক্যালোরি রয়েছে। ক্যালরি কম থাকায় ডায়াবেটিস ও স্থুলকায়দের জন্য খুবই উপকারী ফল। এটি অদ্রবণীয় ফাইবার ও শালিজাতীয় সমৃদ্ধ। এই আঁশ হজম ও বিপাকক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে, ওজন কমাতে সাহায্য করে।

তিন মাসে দুই থেকে পাঁচ কেজি ওজন কমাতে চাইলে খাবার খাওয়ার ত্রিশ মিনিট আগে এক গ্লাস জাম্বুরার রস খান, ওজন কমবে। এটি গবেষণায় প্রমাণিত। 

২০০৬ সালের জার্নাল অফ মেডিসিনাল ফুড এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয় যে, যারা প্রতিবার খাবার পূর্বে অর্ধেক জাম্বুরা খান তাদের খাবারের অন্যকোন পরিবর্তন করা ছাড়াও ১২ সপ্তাহে সাড়ে তিন পাউন্ড ওজন কমে।

সর্দি-জ্বর

সম্ভব ডটকম

প্রতিদিন একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের যতটা ভিটামিন ‘সি’ প্রয়োজন, একটা জাম্বুরাতে তার চেয়ে বেশি পাওয়া যায়। ঠান্ডা, সর্দি-জ্বর ইত্যাদি সমস্যায় জাম্বুরা বেশ উপকারী। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। মুখ এবং পাকস্থলীর ক্যান্সার থেকেও সুরক্ষা দেয় ভিটামিন সি। শরীরের ফ্রি র‍্যাডিকেলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেও সাহায্য করে জাম্বুরা । দৈনিক ভিটামিন সি এর চাহিদার ৭৮% পূরণ করতে পারে অর্ধেকটা জাম্বুরা।

হৃদরোগে সুরক্ষা

জাম্বুরায় রয়েছে প্রচুর পরিমানে পটাশিয়াম। এটি রক্তনালি প্রসারিত করে ও রক্তচাপ কমায়। জাম্বুরা কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে। জাম্বুরার পেকটিন রক্তে কলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয় সেইসঙ্গে হৃদরোগের হাত থেকে রক্ষা করে।

ক্যান্সার সুরক্ষা

প্রতিদিন এক গ্লাস করে বাতাবি লেবু জুস করে খেলে ক্যান্সার প্রতিরোধে কাজ করে। জার্নাল অফ নিউট্রিশনাল বায়োকেমেস্ট্রিতে প্রকাশিত গবেষণায় জানা যায় যে, প্রোস্ট্রেট ক্যান্সার কোষের ক্ষতিগ্রস্থ DNA এর মেরামতে সাহায্য করে জাম্বুরা। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ভিটামিন সি ক্যান্সারের ঝুঁকি কমার সাথে সম্পৃক্ত। 

বাতাবি লেবুতে আছে বায়োফ্লভনয়েড যা ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি থেকে মানুষকে রক্ষা করে। এটি প্রাকৃতিক ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ ফল, এবং এর ফ্ল্যাভোনয়েড ফুসফুসের এবং মুখের গহ্বরে ক্যান্সার হুয়া থেকে রক্ষা করে।

দৃষ্টি শক্তির বৃদ্ধি

এক গবেষণায় দেখা গেছে, জাম্বুরা ফল খাওয়ার ফলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য আছে যা দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য উপাদান। এতে ভিটামিন রয়েছে (প্রতি ১০০ গ্রামে ১১৫০IU), এছাড়াও এটি অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, ফাইবার, বায়োফ্লভনয়েড, পেকটিন বিটা ক্যারোটিন, ম্যাঙ্গানিজের উত্তম উৎস।

দাঁতের মাড়ির রোগ নিয়ন্ত্রণে

মাড়িকে সুস্থ রাখার জন্য ভিটামিন সি অত্যাবশ্যকীয়। ব্রিটিশ ডেন্টাল জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায় যে, যাদের মাড়ির রোগ আছে তাদের প্রতিদিন জাম্বুরা খেলে মাড়ির রক্ত ঝরা কমে যায়। এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ভিটামিন সি গ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধির ফলে মাড়ির সমস্যা ভালো হয়।

কিডনিতে পাথর দূর করার উপায়

জাম্বুরা নারিনজেনিন থাকে যা কিডনিতে সিস্ট হওয়া প্রতিরোধ করে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টিইনফ্লামেটরি প্রভাব শুধু কিডনির সিস্ট গঠনেই বাঁধা দেয় না বরং কিডনির ফোলা কমাতেও সাহায্য করে।

ক্ষতস্থানে জাম্বুরা

চলতে ফিরতে আমরা নিজেরা বা আমাদের ছোট ছোট বাচ্চা ছেলে মেয়ে এমনকি বয়স্করাও প্রায়শই হাত পা কেটে ফেলে । তবে এ ক্ষেত্রে জাম্বুরা খুব ভাল কাজ করে।  যে কোনো ধরনের কাটা ছেঁড়া ও ক্ষত স্থানে হালকা জাম্বুরার জুস বা রস লাগিয়ে দিলে এটা বেশ কার্যকরী।

এসিডিটি রোধে জাম্বুরা

প্রতি ১০০ গ্রামে বিটা ক্যারোটিনের পরিমাণ ১২০ মি.গ্রা, ভিটামিন ৬০ গ্রাম, ভিটামিন ‘বি’ ও থাকে যা এসিডিটি বা গ্যাস প্রতিহত করে। তাই যাদের গ্যাস বা এসিডিটির সমস্যা হয় তারা জাম্বুরা খেলে উপকার পাবেন বলে আশা করা যায়।

রক্ত পরিষ্কার রাখে

জাম্বুরার ভিটামিন ‘সি’ রক্ত পরিষ্কার রাখে এবং রক্তনালির সংকোচন-প্রসারণের ক্ষমতা বাড়ায়। রক্তের লোহিত কণিকাকে টক্সিন ও অন্যান্য দূষিত পদার্থের হাত থেকে রক্ষা করে বিশুদ্ধ অক্সিজেন পরিবহনে সহায়তা করে। ভিটামিন ‘সি’ বেশি থাকায় রক্তনালির সংকোচন-প্রসারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ডায়াবেটিস, জ্বর, নিদ্রাহীনতা, মুখের ভেতরে ঘা, পাকস্থলী ও অগ্ন্যাশয়ের বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

বয়স ধরে রাখে

এটি বার্ধক্য প্রতিরোধে সহায়তা করে। অল্প বয়সে বৃদ্ধলোকের মতো দেখাটা বেশ বিরক্তিকর সমস্যা। দেখা গেছে বয়স হবার অনেক আগেই অনেককে দেখতে বয়স্ক বয়স্ক লাগে। জাম্বুরাতে রয়েছে নানা প্রকার  অ্যান্টি অক্সিডেন্ট । জাম্বুরায় থাকা এই অ্যান্টি অক্সিডেন্ট বয়স ধরে রাখতে সহায়তা করে এবং বুড়িয়ে যাওয়া বিলম্বিত করে।  জাম্বুরায় স্পারমেডিন নামক একটি বিশেষ উপাদান রয়েছে।

মজবুত হাড়

আমাদের দেহে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও সোডিয়ামের অভাব হলে অস্টিওপোরোসিসসহ হাড়ের নানাবিধ রোগ দেখা দেয়। জাম্বুরাতে এই খনিজ উপাদানসমূহ পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায়।

সম্ভব ডটকম
সম্ভব ডটকম

সতর্কতাঃ
জাম্বুরার এত সব গুনাগুন দেখে আকৃষ্ট হয়ে রাস্তার পাশে মসলা মাখানো জাম্বুরা না খাওয়াই উত্তম। আর একটি ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পটাশিয়াম থাকার কারণে কিডনি বিকলতার রোগীরা জাম্বুরা বেশি পরিমাণে খেতে পারবেন না। আবার যাঁদের রক্তচাপ কম, তাঁদেরও একটু সাবধানে খেতে হবে।

বাংলাদেশে মৌসুমি ফল হিসেবে জাম্বুরার প্রচুর সমাদর রয়েছে। হাল্কা টক স্বাদের সুস্বাদু এই ফল ফলটি অত্যন্ত পুষ্টিকর। দেশের বাহিরে ও এই ফলের অস্থিত্ব রয়েছে ভারত, চীন, জাপান, ফিজি, দক্ষিণ আফ্রিকা, এমনকি আমেরিকাতেও তবে বিভিন্ন জায়গায় আলাদা আলাদা রকমের বাতাবী লেবু পাবেন। কোথাও জাম্বুরার ভেতরের রসাল কোষগুলো হলুদ আবার কোথাও লাল বা গোলাপি হয়ে থাকে।