আপনি ঘুমের মধ্যে বকবক করেন? জেনে নিন; আসল কারণ ও সেরা সমাধান

557

ঘুমের মধ্যে আমরা যখন অসচেতন ভাবেই কথা বলি, তখন তাকে বলে স্লিপিং টক। এই সময়ে শুধু যে মানুষ কথা বলে তা নয়। সে হাসতে পারে, বিড়বিড় করতে পারে আবার চিল্লিয়ে উঠতেও পারে। আর এই কথা কিন্তু ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ডের বেশি হয় না। তাই অনেকে এটি বুঝতে পারেন না ভালো করে। গবেষণা বলছে এই কথার বেশির ভাগ অংশ অতীতের কোনও ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকে। এটাও দেখা গেছে যে শিশু এবং পুরুষরাই বেশি সমস্যায় পড়েন এই ক্ষেত্রে

আমরা অনেকেই ঘুমনোর সময় কথা বললেও এ সম্পর্কে আমাদের কোনও জ্ঞানই থাকে না। শুধু তাই নয়, অন্যরা যখন এই বিষয়ে আমাদের জানায়, তখন ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই এই বাস্তব সত্যটাকে মেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে খুব কষ্টকর হয়। তাই তো কখনই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে না যে ঘুমের ঘোরে কথা বলার কারণে আমাদের শরীরের উপর কোনও কু-প্রভাব পরে কিনা! আচ্ছা, সত্যিই কি ঘুমনোর সময় কথা বলাটা ক্ষতিকারক? চলুন জানার চেষ্টা চানানো যাক এই বিষয়ে।

« এক নজরে দেখুন এই প্রতিবেদনে কি কি রয়েছে »

কী এই “স্লিপ টকিং”

ঘুমনোর সময় কথা বলার সমস্যাকে চিকিৎসা পরিভাষায় “সমনিলোকিউই” বলা হয়ে থাকে। এটা এক ধরনের রোগ। তবে এই নিয়ে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। কিছু ক্ষেত্রে আপনা থেকেই এই সমস্যা কমে গেলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিদিষ্ট চিকিৎসার প্রয়োজন পরে। রোগী ঘুমনোর সময় যেহেতু এই বিষয়ে সচেতন থাকেন না, তাই ভাষা এবং কথা বলার ধরণ একেবারে বদলে যায়। কিছু ক্ষেত্রে তো কথার বিষযবস্তু সম্পর্কে ধারণাই করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে আবার স্লিপ টকিং-এর ধরণ গোঙানির মতোও হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে একটা জিনিসই বলার যে, যখনই জানতে পারবেন যে আপনি এমন সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন, বিষয়টিকে উড়িয়ে না দিয়ে চিকিৎসকের পরমর্শ নেবেন। তাহলেই আর কোনও চিন্তা থাকবে না।

কেন হয় এটি?

সাধারণত ঘুমের নির্ধারিত সময় না থাকলে এই ধরণের সমস্যা দেখা যায়। এই কারণেই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ঘুমানো এবং ঘুম থেকে ওঠা উচিত। এক্ষেত্রে অবশ্য নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম মানে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। যত কম ঘুম হবে ঘুমের মধ্যে কথা বলার প্রবণতা ততই বাড়বে।
আসলে ঘুমের মধ্যে কথা বলা নিজে কোনও রোগ নয়। কিন্তু এর মুলে যা যা থাকে তা কিন্তু বড় কোনও রোগের আকার নিতে পারে। তাই আগে জেনে নিই কী কী কারণে হয় এই বিষয়টি।

কারা বেশি আক্রান্ত হন এই রোগে?

একাধিক গবেষণায় পর দেখা গেছে এই ধরনের সমস্যায় সাধারণত পুরুষ এবং বাচ্চারাই বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। তবে কেন এমনটা হয়ে থাকে, সে বিষয়ে যদিও এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি, গবেষণা চলছে। আশা করা যেতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই বিষয়েও স্পষ্ট ধারণা করে নেওয়া যাবে।

ঘুমের সময় কী ধরনের কথা বলে থাকি আমরা?

যেমনটা আগেও আলোচনা করা হয়েছে যে, ঘুমনোর সময় অবচেতন মনে যেহেতু কথা বলা হয়, তাই অন্যদের পক্ষে তা বোঝা বেশ কষ্টকর হয়। তবে বেশ কিছু গবেষাণায় প্রমাণিত হয়েছে যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্লিপ টকিং-এর বিষয়বস্তু হয় পুরনো কোন ঘটনা অথবা খারাপ অভিজ্ঞতা।

অত্যাধিক ক্যাফাইন গ্রহণ

মদ্যপান বা ক্যাফাইনযুক্ত পানীয় গ্রহণের ফলে মানুষ ঘুমের মধ্যে কথা বলার মতো সমস্যার সম্মুখীন হয়। তাই এই সমস্যার সমাধান করতে ক্যাফাইন জাতীয় পানীয় গ্রহণের প্রবণতা কমানো প্রয়োজন। এছাড়াও রাতে ঘুমানোর আগে ভারী খাবার খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করুন।

ডাক্তারের পরামর্শ নিন

আপনার ঘুমের যদি অত্যন্ত সমস্যা হয় তবে দেরী না করে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন। অনেক সময় বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার জন্য ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়। এর জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা ও ওষুধ সেবন করা প্রয়োজন।

ঘুমের মধ্যে কথা বলা বন্ধ করবেন যেভাবে

অনিদ্রা

আমাদের যদি নিয়ম করে ঘুম না হয়, অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঘুম না হয় তাহলে বেশ কয়েক দিন পর থেকে এই সমস্যা হয়।

চিন্তা

আমাদের মধ্যে কেই বা আজ আছে যার চিন্তা নেই। আর আমরা অনেক সময়ে কিছু কিছু চিন্তা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি না। আর এমনই কিছু চিন্তা গভীর আকার নিয়ে ডিপ্রেশনের জায়গা নেয়। আর এটি আমাদের সাবকনসাশের মধ্যে থেকে যায়। রাতে যখন আমাদের নার্ভ দুর্বল থাকে, তখন এই চিন্তা বাঁ না বলতে পারা কথা ঘুমের মধ্যে বেরিয়ে আসে।

দুঃস্বপ্ন

আমরা অনেকেই দুঃস্বপ্ন দেখি রাতে। সেই দুঃস্বপ্নের সময়েও কিন্তু আমরা কথা বলে থাকি নিজের মনেই।

অত্যধিক মদ্যপান

অত্যধিক মদ্যপান

মদ খেলে এবং তা নিয়ম করে, আমাদের নিজেদের নার্ভের উপর কন্ট্রোল চলে যায়। নার্ভ দুর্বল হয়ে যায়। তখন রাতে ঘুমনোর সময়ে আমাদের কিছু স্মৃতি বেরিয়ে আসে।

বিশেষ ওষুধ

আমরা অনেক সময়েই ঘুম না হলে ওষুধ খেয়ে নিই। এটা সাময়িক ভাবে হলে ঠিক আছে। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে কেউ ঘুমের ওষুধের উপর নির্ভর করে থাকলে তাঁর এই সমস্যা হতে পারে।

ভালো করে ঘুমোন

রোজ নিয়ম করে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমোতেই হবে। নইলে কিন্তু আপনার নার্ভ আর মাথা যথেষ্ট বিশ্রাম পাবে না। ফলে এই সমস্যা হবেই। খুব বেশি খেলে ঘুম ভালো হয় না। তাই ঘুমোতে যাওয়ার ৩ ঘণ্টা আগে খাওয়া শেষ করুন। ভালো নরম বালিশ ব্যবহার করুন।

চিন্তা কম করুন

চিন্তা তো থাকবেই। কিন্তু চেষ্টা করুন খুশি থাকার। আর দরকার হল চিন্তার বিষয়টা ভাগ করে নিন কাছে মানুষের সঙ্গে। তাহলে অনেকটা হাল্কা লাগবে।

অ্যালকোহল বন্ধ

অ্যালকোহল তো খুব একটা ভালো জিনিস নয়। তাহলে খাবেন কেন? দেখুন অ্যালকোহল খেয়ে খানিক ঝিমিয়ে চিন্তা থেকে সাময়িক মুক্তি মেলে, কয়েক ঘণ্টার জন্য। নেশা কাটলে আপনি আবারও সেই চিন্তার মধ্যে। তার থেকে বরং নেশা বন্ধ করুন আর সমস্যার সুস্থ সমাধান খুঁজুন।

ক্রনিক কার্ডিওতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি?

নতুন মা কে অভিনন্দন জানাতে এই উপহারগুলি দিতে পারেন সারাদিন ঘরে বসে থাকে? বাইরে খেলার জন্য কি করে পাঠাবেন আপনার বাচ্চাকে?

স্লিপ টকিং কতটা ক্ষতিকারণ

এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে স্লিপ টকিং-এর কারণে সরাসরি শরীরের কোনও ক্ষতি হয় না। তবে সামাজিক অপমাণের ভয়ে এমন রোগীরা নিজেদের বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও রাত কাটাতে চান না। কী কথা বলে বলে ফেলবেন সেই ভয়ে অনেকেই নিজের বাড়িতেও রাতের পর রাত জেগে কাটিয়ে দেন। ফলে অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।

এই ধরনের সমস্যা কেন হয়?

অনেক কারণে স্লিপ টকিং-এর মতো আপাত সাধারণ রোগটি হতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্ট্রেস এবং ডিপ্রেশনের কারণে এই ধরনের সমস্যা মাথা চারা দিয়ে ওঠে। এছাড়াও আরও যে যে কারণগুলি এক্ষেত্রে দায়ি থাকে, সেগুলি হল- পর্যাপ্ত সময় না ঘুমনো, দিনের বেলা ঘুমের ঘোর, মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন, জ্বর প্রভৃতি।

প্রসঙ্গত, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে স্লিপ টকিং-এ আক্রান্ত হওয়ার পিছনে পারিবারিক ইতিহাসও অনেক সময় দায়ি থাকে। অর্থাৎ জিনগত কারণেও এই রোগ হতে পারে। শুধু তাই নয়, অনেক সময় স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং আর ই এম স্লিপ বিহেভিয়ার ডিজঅর্ডারের মতো রোগের কারণেও অনেকে ঘুমনোর সময় কথা বলে থাকেন।

ঘুমনোর সময় আমরা কিন্তু পুরোটা সময় একইভাবে ঘুমাই না। কখনও আমাদের ঘুম খুব গভীর হয়, তো কখনও খুব পাতলা।

দেখা গেছে, ঘুম পাতলা হওয়ার সময় যারা কথা বলেন, তাদের কথার ধরন বেশ স্পষ্ট হয় এবং কী বলছেন তা বোঝা যায়। অন্যদিকে গভীর ঘুমের সময় কথা বললে একেবারে উল্টো ঘটনা ঘটে।

আচ্ছা, সত্যিই কি ঘুমনোর সময় কথা বলাটা ক্ষতিকারক?

রোগী ঘুমনোর সময় যেহেতু এই বিষয়ে সচেতন থাকেন না, তাই ভাষা এবং কথা বলার ধরণ একেবারে বদলে যায়। কিছু ক্ষেত্রে তো কথার বিষযবস্তু সম্পর্কে ধারণাই করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে আবার স্লিপ টকিং-এর ধরণ গোঙানির মতোও হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে একটা জিনিসই বলার যে, যখনই জানতে পারবেন যে আপনি এমন সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন, বিষয়টিকে উড়িয়ে না দিয়ে চিকিৎসকের পরমর্শ নেবেন। তাহলেই আর কোনও চিন্তা থাকবে না।

চিকিৎসা

ঘুমের মধ্যে কথা বলার প্রবণতা যে কোনো বয়সের যে কোনো মানুষের মধ্যে দেখা দিতে পারে। তবে শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এটা খুবই সাধারণ সমস্যা।

এই ধরনের সমস্যায় সাধারণত কোনও চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। এক্ষেত্রে কতগুলি নিয়ম মানলেই সুফল মেলে।

যেমন- ঘুমনোর আগে বিছানা ভাল করে পরিষ্কার করে নিতে হবে, স্ট্রেস লেভেল কমাতে হবে, ডিপ্রেশনে ভুগছেন এমনটা মনে হলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করবেন, অ্যালকোহল কম খাবেন এবং রাতে টানা ৬-৮ ঘন্টা ঘুমনোর চেষ্টা করবেন। এই নিয়মগুলি মানলেই দেখবেন এই রোগ একেবারে কমে যাবে। তবে এইসব ঘরোয়া পদ্ধতিগুলির কাজে লাগানোর পরেও যদি রোগের প্রকোপ না কমে, তাহলে জেনারেল ফিজিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় থাকবে না।

ঘুমের সময় কী কথা বলছেন সে বিষয়ে কী জানতে চান?

এক্ষেত্রে কতগুলি অ্যাপ আপনাকে সাহায্য করতে পারে। যেমন- ড্রিম টক রেকর্ডার, স্লিপ টক রেকর্ডার, ওয়েকআপ প্রো প্রভৃতি। ঘুমনোর সময় কথা বলা মাত্র এই অ্যাপগুলি আপনার কথা রেকর্ড করতে শুরু করে দেয়। ফলে সকালে উঠে আপনার পক্ষে জেনে নেওয়া সম্ভব হয়, রাতের বেলা অবচেতন মনে কী কী কথা বলেছেন অপনি। প্রসঙ্গত, আজ পর্যন্ত প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ এইসব অ্যাপ ব্যবহার করে সুফল পেয়েছেন। এবার আপনিও এইসব আধুনিক প্রয়ুক্তিগুলি কাজে লাগিয়ে দেখুন না ফল পান কিনা!

স্লিপ টকিংয়ের প্রতিকার

শোবার আগে খুব বেশি পেট ভরে না খাওয়া, অ্যালকোহল বা মদ্যপান না করা, ঘুমানোর সময় অতিরিক্ত চিন্তা না করা, পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমের মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে অনেকাংশে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এছাড়াও চিনিযুক্ত ও ক্যাফেইন সমৃদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলুন।

ঘুমের মধ্যে কথা বলা বন্ধের করণীয়

নিজেকে স্ট্রেসমুক্ত রাখুন। অবসাদে ভুগলে, অবশ্যই মনোবিদের পরামর্শ নিন।

ঘুম কম হলেও এই সমস্যা হয়। তাই দিনে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমোন।

ঘুমনোর আগে মদ্যপান বন্ধ করুন। অনেকেই ঘুমনোর আগে মিষ্টি বা অন্যান্য স্ন্যাক্স খান। এই অভ্যাস বন্ধ করুন।

এবার তাহলে আর স্লিপিং টকের জন্য কথা শুনতে হবে না। এগুলো করেই দেখুন আর নিয়ম করে চলুন। দেখবেন এতে সব দিক থেকেই ভালো হবে।