আদার ৩০টি উপকারিতা ও ক্ষতিকর দিক সমূহ

818
আদা

বাঙালির রান্নার উপাদানগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মসলা রয়েছে। আদাও তেমনি একটি মসলা। তবে নানা গুণের কারণে একে সুপারফুডও বলা হয়। 

আদা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি সমৃদ্ধ। রান্নায় আদা বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা ছাড়াও আদার রস ও আদা চা পান করি আমরা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখেছেন, টানা ২৮ দিন মাত্র  দু’গ্রাম করে আদা খেলে ঘাতক রোগ ক্যান্সার  প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্যান্সার রিসার্চ’র একটি জার্নালে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। 

« এক নজরে দেখুন এই প্রতিবেদনে কি কি রয়েছে »

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে

আদাতে অ্যান্টিডায়াবেটিক উপাদান আছে। গবেষণায় জানা গেছে যে, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে আদা এবং যাদের ডায়াবেটিস নেই তাদেরও। ১ কাপ আদার রস খালি পেটের গ্লুকোজ লেভেলও নিয়ন্ত্রণ করে।

মানসিক বয়স বৃদ্ধি বিলম্বিত করে

আদায় ফেনল ও ফ্ল্যাভোনয়েড উপাদান থাকে। এছাড়াও নিউরোপ্রোটেক্টিভ বৈশিষ্ট্য আছে আদার। আদার রসে মস্তিস্ককে স্বাস্থ্যবান রাখার জন্য প্রোটিনের লেভেল বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ফলে বৃদ্ধাবস্থার বিভিন্ন সমস্যা যেমন- আলঝেইমার্স ও অন্যান্য মানসিক সমস্যার বিরুদ্ধে কাজ করে।

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে

আস্ত আদায় বিভিন্ন ধরণের বায়োএকটিভ ফেনোলিক্স এবং নন ভোলাটাইল পাঞ্জেন্ট উপাদান যেমন- জিঞ্জেরলস, প্যারাডলস, শোগায়োল এবং জিঞ্জেরোনেস থাকে। গবেষণায় জানা যায় যে, আদার রসে ক্যান্সারনাশক উপাদান থাকে। প্রোস্টেট ক্যান্সারের ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করে আদার রস।

জিআই ক্যান্সার থেকে সুরক্ষা দেয়

পরীক্ষামূলক গবেষণায় জানা যায় যে, আদা ও এর সক্রিয় উপাদান ৬-জিঞ্জেরল ও ৬-শোগায়োল গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টাইনাল ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে।

কোলেস্টেরল কমায়

যেহেতু আদা গ্লুকোজের মাত্রার উপর কাজ করে তাই মনে করা হয় যে, আদা কোলেস্টেরলের স্তরও কমাতে পারে।

আরথ্রাইটিসের ব্যথা কমায়

একটি গবেষণায় জানা যায় যে, আদার রসে ব্যথা নাশক উপাদান আছে। দীর্ঘস্থায়ী হাঁটু ব্যথার রোগীদের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে আদা।

আদার জুস তৈরি করবেন যেভাবে-

একটি আদা ভালো করে ধুয়ে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিন। তারপর একটি মিক্সারে সামান্য পানিসহ আদাকুচি দিয়ে ভালো করে চূর্ণ করুন। তারপর ছেকে রসটুকু আলাদা করুন। এর মাঝে লেবুর রস ও মধু মিশিয়ে নিন, ব্যস তৈরি হয়ে গেল আদার জুস।

হজমে সুবিধা

অনেকেরই হজমে সমস্যা থাকে।  এমনকি তাদের বাথরুম হ্যাবিট নিয়মিত থাকে না। নিয়মিত আঁশযুক্ত সবজি খাবার পরেও তাদের কোষ্ঠকাঠিন্য লেগে থাকে। আমান্ডারও এ সমস্যাটি ছিলো। কিন্তু আদা খাওয়ার তিনদিনের মাথায় প্রতিদিন সকালে একই সময়ে তার পেট পরিষ্কারের অভ্যাস হয়ে যায়। এছাড়া সবজি খাওয়ার পর পেট ফাঁপার সমস্যাটিও দূর হয়ে যায়। 

ব্যায়ামের পর শরীর ব্যথা দূর

আমান্ডা নিয়মিত স্ট্রেংথ ট্রেইনিং করেন।  জিম করার পর সবসময় শরীর ব্যথা হতো তার। কিন্তু আদা খাওয়া শুরু করার ৩-৪ দিন পর তিনি দেখেন, শরীরের ব্যথা অনেকটাই কমে গেছে।  তার আর ব্যথা দূর করার ওষুধ খেতে হচ্ছে না।

রাত্রে ক্ষুধা দূর

এক সপ্তাহ আদা খাওয়ার পর আমান্ডা দেখেন, সকালের জিনজার শটটা পান করা খুব একটা সহজ নয়, এর স্বাদটি খুবই তীব্র। তবে রাত্রের এক কাপ আদা চা পান করাটি সহজ হয়ে এসেছে। এর পাশাপাশি মাঝরাতের দিকে ক্ষুধা থেকে জাঙ্ক ফুড খাওয়ার প্রবণতাও কমে এসেছে।

এ সুবিধাগুলো পাওয়ার পর আমান্ডা সিদ্ধান্ত নেন, সকালের জিনজার শট পান করা বন্ধ করলেও তিনি রাত্রে আদা চা পান করা চালিয়ে যাবেন।  আপনিও চাইলে আদা চা তৈরি করে পান করতে পারেন রাতের খাবারের পর।

জ্বর, ঠাণ্ডা ও ব্যথায় আদা উপকারী

আমাদের যখন হঠাৎ অসুস্থ্য হয়ে পড়ি সাথে সাথে ডাক্তারের কাছে দৌড়ে যাই। কিন্তু এই অসুস্থ্যতা ঘরোয়াভাবে ঔসুধের চাইতে ভালো কার্যকারী ভূমিকা পালন করে। কারণ আদায় এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা বডি টেম্পারেচারে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। শীতকালে ঠাণ্ডার সময় তাই আদা চা খেতে পারেন।

২/ঋতু পরিবর্তনের সময় অ্যাজমা, মাইগ্রেনের মতো সমস্যা প্রায়শই দেখা যায়। এই সময়ে ডায়েটে আদা রাখুন। সর্দি-কাশির প্রকোপের সময় মুখে আদা রাখলে, আরাম পাবেন।

বমি-বমিভাব

গা গোলানো, মাথা গোলানো ও বমিভাব থেকে রেহাই পেতে কয়েক কুচি আদা চিবিয়ে খেয়ে দেখুন। সমস্যা অনেকটা কমবে।

কোলেস্টেরল কমায়

আর্টারি ওয়ালে ব্যাড কোলেস্টেরল ও ফ্যাটি অ্যাসিড জমে করোনারি হার্ট ডিজিজের সমস্যা দেখা যায়। ফলে রক্ত চলাচলে অসুবিধে দেখা যায়। আদা রক্ত চলাচলে সাহায্য করে। লিভার ও ব্লাডে কোলেস্টেরল অ্যাবজর্বশন কম রাখতে আদা সাহায্য করে।

মেদ কমায়

অতিরিক্ত ওজন ঝরাতেও আদা সাহায্য করে। টিস্যু বেশি এনার্জি ব্যবহার করায়, বেশি ক্যালরি বার্ন হয়।

হার্ট রোগ প্রতিরোধ

অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর আদা ক্যান্সার ও হার্টের সমস্যা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ওভারিয়ান ক্যান্সার প্রতিরোধে আদা উপকারী।

১০০ গ্রাম আদায় যা যা রয়েছে –

এনার্জি: ৮০ ক্যালরি
কার্বোহাইড্রেট: ১৭ গ্রাম
ফ্যাট: ০.৭৫ গ্রাম
পটাশিয়াম: ৪১৫ মিলিগ্রাম
ফসফরাস: ৩৪ মিলিগ্রাম

আদার আরো কিছু ওষুধি দিক

আর্থ্রাইটিসের সমস্যায় ভুগলে সারা দিনের খাবারে অল্প পরিমাণে আদা রাখার চেষ্টা করুন। আদা দিয়ে চা খেতে পারেন, সালাদে আদার সরু, লম্বা কুচি মেশাতে পারেন। ব্যথার সমস্যা ধীরে ধীরে কমবে। ঘন ঘন ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস কমিয়ে আদা খেয়ে দেখতে পারেন। আর্থ্রাইটিসের ব্যথা কমাতে জিঞ্জার অয়েল উপকারী।

সতর্কতা

১. গলস্টোনের সমস্যা থাকলে কত পরিমাণ আদা খাবেন, ডাক্তারের থেকে জেনে নিন।
২.গর্ভাবস্থায় সারা দিনে ২৫০ গ্রামের বেশি আদা খাবেন না। ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া বাঞ্ছনীয়।

বমিভাব বা বমি হচ্ছে অনেক? আদা কুচি করে চিবিয়ে খান অথবা আদার রসের সাথে সামান্য লবণ মিশিয়ে পান করুন। তাৎক্ষণিক সমাধান পেয়ে যাবেন।

উল্টাপাল্টা এবং বেশি ভাজাপোড়া খাবারের কারণে বুকজ্বলার সমস্যা হুট করেই শুরু হতে পারে। এক কাজ করুন, ২ কাপ পানিতে ২ ইঞ্চি আদা ছেঁচে জ্বাল দিয়ে চায়ের মতো তৈরি করে পান করুন। বুকজ্বলা কমে যাবে।

ব্যথানাশক ঔষধ

আদার রস ব্যথানাশক ঔষধের মতো কাজ করে। সরাসরি আক্রান্ত স্থানে লাগাতে পারেন আদার রস অথবা পান করে নিতে পারেন, দুভাবেই ভালো উপকার পাবেন।

প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি

নতুন আদার সাথে আধা সেদ্ধ ডিম খাওয়ার অভ্যাস পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা বাড়ায় এবং স্পার্ম কাউন্ট বৃদ্ধি করে।

হজম

আদা হজমে সমস্যা সমাধান করে এবং পেটে ব্যথা দূর করতে সহায়তা করে। প্রতিদিন সকালে ১ কাপ আদা চা পান করলে পুরোদিন পেট ফাঁপা বা বদহজম থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন।

ব্যথানাশক

অসটিও আর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে শরীরের প্রায় প্রতিটি হাড়ের জোড়ায় প্রচুর ব্যথা হয়। এই ব্যাথা দূর করে আদা। তবে রান্না করার চেয়ে কাঁচা আদা এক্ষেত্রে বেশি কার্যকরী, এতে আদার পুষ্টিগুণও বেশি থাকে। শরীরের যেকোন ধরনের ব্যথাতে আদা টনিকের মতো কাজ করে।

ঋতু পরিবর্তনজনিত হালকা রোগে

ঠাণ্ডায় আদা ভীষণ উপকারী। এতে রয়েছে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান; যা শরীরের রোগজীবাণু ধ্বংস করে। জ্বর জ্বর ভাব, গলাব্যথা ও মাথাব্যথা দূর করতে সাহায্য করে আদা। কাশি এবং হাঁপানির জন্য আদার রসের সাথে মধু মিশিয়ে সেবন করলে বেশ উপকার মেলে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় আদা। এক গবেষণায় দেখা গেছে, আদার রস দাঁতের মাড়িকে শক্ত করে, দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা লুকানো জীবাণুকে ধ্বংস করে।

ক্ষত শুকাতে

দেহের কোথাও ক্ষত থাকলে তা দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে আদা। এতে রয়েছে অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি, যা কাটাছেঁড়া, ক্ষত দ্রুত ভালো করে।

চিকিৎসায়

আমাশয়, জন্ডিস, পেট ফাঁপা ইত্যাদি সমস্যায় আদা চিবিয়ে বা রস করে খেলে উপকার পাওয়া যায়। এছাড়া গলা পরিষ্কার রাখার জন্য আদা খুবই উপকারী।

রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে

পরিমিত আদা খাওয়ার অভ্যাসে শরীরের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হয়। আদায় রয়েছে ক্রোমিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও জিঙ্ক। এসব উপাদান রক্ত প্রবাহের প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখে।

বমিভাব দূর করে

যানবাহনে চড়ার সময় কেউ কেউ অস্বস্তিতে ভোগেন বা কিছুক্ষণ গাড়িতে থাকার পর বমি চলে আসে। বমি বমি ভাব দূর করতে আদার ভূমিকা অপরিহার্য। বমি ভাব হলে কাঁচা আদা চিবিয়ে খেতে পারেন। এটি তাৎক্ষণিক উপকার মেলে। আর এতে মুখের স্বাদও বাড়ে।

ঠাণ্ডা-জ্বরে আদা

ঠাণ্ডা লাগা ও ভাইরাস জ্বর প্রতিরোধে আদা বিশেষ ভূমিকা রাখে। আদার রস একটু গরম করে সমপরিমান মধুর সাথে মিশিয়ে দিনে কয়েকবার খেলে ঠাণ্ডা লাগা ও ভাইরাস জ্বর সেরে যায়।

পেট ব্যাথা

পেটের অস্বস্তি বা পীড়ায় আদা একটি আদর্শ পথ্য। হজমে সহায়তার পাশাপাশি খাবারের গুণাগুণ শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে দিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে আদা। কিছু খাওয়ার পর পেটব্যথায় ভোগার সমস্যা হলে তা দূর করে আদার রস। পেটে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণও প্রতিরোধ করে এটি।

ফুসফুসের জন্য উপকারী

ফুসফুসের সাধারণ যে কোন সংক্রমণ বা রোগের ক্ষেত্রে আদা বেশ কার্যকরী। সর্দি- কাশি, শ্বাস- প্রশ্বাসের সাধারণ সমস্যা দূর করে আদা। গলা ও স্বরতন্ত্রী পরিষ্কার রাখে।

অবাক হচ্ছেন, আসুন এক নজরে জেনে নেই আদা খাওয়ার সংক্ষিপ্ত আরো কয়েকটি প্রয়োজনীয় উপকারিতা।

কিভাবে আদা খাবেন ?

১. আদায় সামান্য পানি দিয়ে থেতলে নিন। আদার রস ও আদা গরম পানিতে কিছুক্ষণ ফুটিয়ে নিন। চা বানানোর জন্যে এই পানি ব্যবহার করুন।

২. আদা ছিলে , সামান্য লেবুর রস মেশান। হজমে এই মিশ্রণ খুব ভালো কাজ করে।

৩. সারা দিনে ৫০ গ্রাম আদা খেতে পারেন। পাউডারড জিঞ্জার আধা  চামচ করে দিনে ৩ বার খেতে পারেন। আদা সরু লম্বা করে চিকন করে কেটে নিন। সামান্য লবণ, গোলমরিচ মেশান।

৪. পানি ফুটিয়ে নিন। এবারে দুধ, মসলা, আদার রস, চা পাতা দিয়ে আরো একবার ফুটিয়ে নিন। কাপে চিনি দিয়ে পরিবেশন করুন। ওপরে সামান্য এলাচগুঁড়ো ছড়িয়ে দিতে পারেন।

৫. হজমে সাহায্য করার জন্যে আদা দিয়ে সিরাপ বানিয়ে নিন। জিরে গুঁড়ো, বিট নুন, আদার রস, লেবুর রস, ঠাণ্ডা জল একসাথে মিশিয়ে ব্লেন্ড করুন। তৈরি আদার সিরাপ। দুপুরে বা রাতের খাবারের পরে এই সিরাট খেতে পারেন।

৬. ভিনিগারে আদার টুকরো, লবণ, মরিচ দিয়ে কিছু দিন রাখুন। খাওয়ার সময় আচার হিসেবে খেতে পারে।

আমাদের লেখা থেকে যদি একটুও নতুন কিছু শিখে থাকেন, তাহলে প্লিজ আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না প্লিজ।
যদি শেয়ার করে সবাইকে জানিয়ে দেন, তাহলে আমাদের লিখাটি সার্থক।

ফেজবুকে আমাদের সাথে থাকুন বা আপনার লিখা পাঠান: প্রতিদিনের স্বাস্থ্য টিপস