More

    This Website Under Constraction

    গল্পঃ অন্তহীন ভালোবাসা

    লেখকঃ সালমান হোসেন

    প্রায় ৭০ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধের বিয়ে বাড়ির খাওয়ার টেবিলে হঠাৎ কেঁদে উঠা..
    টেবিলে. বশে থাকা.. আর সবাই বলছেন.. মিয়া ভাই. কি হইছে.? 
    কাঁদতেছেন কেনো.? খাবার কি ভালো হয়নি.??
    নাকি অন্য কোনো সমস্যা..?
    তখন.. বৃদ্ধ লোকটি বললেন.. ছোট মিয়া. আমি এই খাবার.. খেতে. পারবোনা. না রে.. এই খাবার.. খেতে গেলে যে আমার তাকে চাই. তাকে ছাড়া কিভাবে খাবো..?
    কে সে মিয়া ভাই.? আপনার সমস্যা. কি আমাদের বলেন.?
    না কিছু না. তোরা খা.. আমার শরীল খারাপ.. লাগছে. এই সব পোলাও গরুর মাংশ আমি খেতে পারিনা. তোর খা. আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি. 
    এটা কেমন কথা.? আপনি না খেলে আমরা কি ভাবে খাবো.? আর আপনার ভাতিজার বিয়ে সে শুনলে কষ্ট পাবে., কিছু হবেনা. তোরা খা. আমি বাইরে যাচ্ছি.. আচ্ছা মিয়া ভাই..
    কথাটি শেষ করে. বৃদ্ধ লোকটি. বিয়ে বাড়ি থেকে. বের হয়ে. বিয়ে বাড়ি থেকে একটু দূরে. গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কাদছেন. এ কেমন কান্না.? এই বয়সে. কি তার দুঃখ.? কার জন্য চোখের পানি.? নিশব্দে কাকে সে ডাকছে.. কাকে তার আজ এতো মনে পড়ছে.?সেদিন বিয়ে শেষ করে বাড়ি ফিরে এসে. বাড়ির পাশে একটা কবরের পাশে. বসে. চিৎকার দিয়ে কাঁদছে বৃদ্ধ মানুষটি. আর ডেকে ডেকে বলছে. আজ কত গুলো বছর আমি একা তুমি জানো.? তুমি তো সুখের নিদ্রা দিচ্ছ. আর আমি যে কত যন্ত্রণার মধ্যে বেচে আছি. সেটা বিধাতা আর আমি ছাড়া কেউ জানেনা.. কেনো একা চলে গেলে..? আমাকে সাথে নিয়ে গেলেনা কেনো.? সারারাত কবরের পাশে বসে কবরে শুয়ে থাকা মানুষ টির জন্য চোখের পানি আর দোআ করে বৃদ্ধ লোকটি…? এইটা কার কবর.? কাকে ফিরে আসতে বলছে.? হুম, সব জানাবো. এই মানুষ টার জীবন কাহিনী.. চলুন. গল্পের মূল অংশ থেকে শুরু করি..
    .
    সাল টা ছিলো.. ১৯৭৩ টগবগে এক যুবক. নাম তার মফিজুর (ছদ্মনাম).. বয়স ২০ বছর.. স্বাধীনা যুদ্ধে অংশ নিয়েছে এই যুবক.. 
    মফিজুরের বাবা মোঃ সামাদ শেখ মফিজুর কে ডাক দিয়ে বললেন.. বাবা তোমার জন্য একটা মেয়ে দেখেছি.. অনেক সুন্দরী মেয়েটা. আমি আর তোমার মা চাই তোমাকে বিয়ে দিতে. ঘরে একটা বৌমার দরকার. মহিজুর তখন. ১০ম শ্রেনী পাশ করে. কলেজে পড়ছিলো.. কিন্তু পারিবারিক. সমস্যার জন্য পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে নি. তাই এখন. মাঠে কাজ করছে.. মফিজুর হাসি দিয়ে বললো. আপনারা মুরব্বিরা আছেন যেটা ভালো বুঝেন করেন.. আমার আপত্তি নাই.. (আসলে তখন কার সময়ে গ্রামের অধিকাংশ বিয়ে এই বয়সে হতো..)
    বাবা সামাদ শেখ. বললেন. মেয়েকে দেখতে চাইলে দেখতে পারো. মফিজুর বললো না আব্বা দেখার লাগবেনা আপনাদের সিদ্ধান্ত আমার সিদ্ধান্ত.
    সামাদ শেখ বললেন.. আচ্ছা ঠিক আছে আমরা বিয়ের কথা পাকাপাকি করে আসছি. সকল মুরব্বী রা মিলে মেয়ের বাড়ি গেলো.. মেয়েটির নাম ছিলো শাহিদা (ছদ্মনাম).বয়স ১৬ বছর হবে.. পড়ালেখা ৮ এ পড়ছিলো.. মেয়েকে দেখে এই সামনের সপ্তাহে. বিয়ে ঠিক করে আসলেন.. মুরব্বিরা. যথারীতি সময়ে শুক্রবার রাতে মাফিজুর আর শাহিদার বিয়ে হয়ে গেলো. (তখন কার সময়ে সব বিয়ে রাতে হতো যা এখন দেখা যাই না বললেই চলে)..
    বিয়ের রাত টা ছিলো.. জোছনা আলোয় ভরা.. শাহিদা হালকা সাজে ফুলের বিছানা. বসে আছে. নতুন পাঞ্জাবি পরে. বাইরে দাঁড়িয়ে মফিজুর.. ঘরে ডুকতে লজ্জা লাগছে তার. কিন্তু, সে ভাবলো আমি লজ্জা পাচ্ছি কেনো.? এই ভেবে. ঘরে ডুকলো.. মফিজুর. ঘরে ডুকিতেই.. শাহিদা সালাম দিলো. মফিজুর সালামের উত্তর দিলো.. শাহিদা খাট থেকে নেমে. মফিজুরের পায়ে হাত দিলো. মফিজুর কি করবে বুঝতে না পেরে বলে উঠলো.. এইটা কি করছো তুমি.? শাহিদা. লজ্জা ভরা মুখ নিয়ে. মাথা নিচে করে বললো. আপনি জানেন না.. আজ থেকে আপনি তো আমার সব. আপনার পায়ের নিচে. আমার জান্নাত.. মফিজুর বললো.. হুম সেটা তো বুঝতে পারছি. তবে একটা কথা বলি.. আমি চেয়েছিলাম.. আমার যার সাথে বিয়ে হবে. আমি তাকে সারাজীবন বুকে আগলে রাখবো. আর পাঁচটা.. সামীর মত. আমি তোমাকে কাজের.. মেয়ে বানিয়ে ঘরে আনিনি. আমি চাই তুমি আমাকে ভালোবাসবে.. তুমি আমার বাবা- মায়ের.. খেয়াল রাখবে. তাই. তোমার অবস্থান. আমার পায়ে নয়. আমার বুকে. শাহিদা কথাটি শুনে মুচিকি হাসি দিয়ে বললো.. আমি কথা দিচ্ছি. আপনার আর আপনার বাবা- মা.. মানে আজ থেকে. আমার বাবা- মা.. আমি তাদের কখনো অভিযোগ করার..সুযোগ দেবোনা..
    কথাটি শুনে মফিজুর অনেক খুশী হলো.. এই ভাবে অনেক কথা. আর কিছু ভালোবাসার ছোয়াই. রাত পার হয়ে গেলো. ভোরে. সবার আগে শাহিদা ঘুম থেকে. উঠে. মফিজুরের বাবা- মা কে ডাক দিলো নামাজ পড়ার জন্য. মফিজুর কেও ডেকে. উঠালো. মফিজুর অবশ্য. নামাজ আগে থেকেই পড়তো.. সবাই নামা পড়লো. বাড়ির নতুন বউ শাহিদা.. মা কে বললো. মা আজ থেকে আমি রান্না করবো আপনার করতে হবেনা. আজ থেকে এই বাড়ির আপনাদের দায়িত্ব সব আমার. মফিজুরের মা হাসি দিয়ে বললো. তোমার কিছু করতে হবেনা. মা. আমি করবো. তুমি ঐ খানে চুপ করে বসো. শাহিদা বললো. না মা আজ থেকে. আমি করবো. অনেক জোরা জুরি করলো. শাহিদা. কিন্তু মফিজুররে মা রাজি হলেন না. উল্টে. বললেন. তুমি দেখো মফিজুর. কি করতেছে. ও কি কাজে যাবেন.? শাহিদা মফিজুরের কাছে গেলো. যেয়ে বললো. আপনি কাজে যাবেন না.? 
    মফিজুর বললো. না আজ আমি আমার বউয়ের কাছে থাকবো. শাহিদা বললো. না সেটা হবেনা. আপনি কাজে যান. মফিজুর বললো কাল থেকে যাবো. শাহিদা বললো না আজই যান. মফিজুর বললো কথা দিচ্ছি কাল থেকে অবশ্যই যাবো. এই বলে কোনো মতে. রাজি করালো শাহিদা কে. সকালের খাবার মা- বাব কে খায়িয়ে দিয়ে শাহিদা মফিজুরের জন্য ঘরে খাবার নিয়ে আসলো. মফিজুর. বললো. তুমি কি খেয়েছো.? শাহিদা বললো না আপনার খাওয়া হলে খাবো. মফিজুর ধমক দিয়ে বললো.. এখন ই বসো. না খেয়ে এতোক্ষণ. কেনো আছো.? আমার পাশে বসো. শাহিদা চুপ করে মাথা নিচে করে বসলো. মফিজুর বুঝতে পারলো. বয়স তো বেশি না. কিন্তু. একটু বেশি বলা হয়ে গেছে. মফিজুর শাহিদার সুন্দর মুখটাই হাত দিয়ে উঠেয়ে দেখলো. মেয়েটর চোখে পানি..মফিজুর বললো. এই দেখো আবার কাঁদছে আমি তো এমনি বললাম. তুমি কেদোনা. শাহিদা বললো আমার মা-বাবা আমাকে কখনো বকেনি. অনেক আদর করতো. মফিজুর.. বললো. আমি কথা দিলাম আজ থেকে তোমাকে আর কখনো কষ্ট. দেবোনা. এই বলে চোখের পানি মুছে দিলো মফিজুর. 
    মফিজুর ডেকে রাখা খাবার থেকে ডাকনা সরিয়ে দেখলো. পোলাও ভাত গরুর মাংশ.. আর ডিম রয়েছে.
    মফিজুর. ভাত পেলেটে নিয়ে. গরুর মাংশ. দিয়ে.. ভাত মাখিয়ে. শাহিদা কে বললো হা করো. শাহিদা লজ্জা পেয়ে মুখ নিচে করে আছে. মফিজুর বললো. আরে হা করো. আমি খায়িয়ে দিচ্ছি. মফিজুর শাহিদার মুখ টা তুলে. শাহিদাকে খায়িয়ে দিলো..শাহিদা মুচকি হাসি দিয়ে বললো. আমি আপনাকে খায়িয়ে দি.? মফিজুর বললো দাও. দুজন দুজন কে খায়িয়ে দিলো..
    এর মধ্যে শাহিদা বললো. জানেন গরুর মাংশ আর পোলাও আমার সবচেয়ে পছন্দের খাবার. আমার বাবা আমার জন্য প্রতিহাটে গরুর মাংশ এনে দিতেন. মফিজুর বললো. তোমার সামি তো গরীব. তার পরেও. কথা দিলাম. আমিও প্রতি হাটে. তোমাকে. গরুর মাংশ খাওয়াবো.
    শাহিদা বললো. আমার সামি আমাকে যা খাওয়াবে. আমি তাতেই খুশী. আমার গরুর. লাগবেনা. মফিজুর খাওয়া শেষ করতে করতে বললো. সেটা আমি দেখবো.. আচ্ছা চলো ঘুরে আসি. শাহিদা বললো. কোথাই?? মফিজুর বললো. নদীর পাড় থেকে.. শাহিদা বললো. চলেন. দুজন হাত ধরে নদীর পাড় দিয়ে হাটছে আর কিছু গল্প করছে. আর এই ভাবে. সুখে সময় গুলো পার হচ্ছে দুজনের. মফিজুর সারাদিন কাজ করে বাড়ি ফিরে আসে. দেখে শাহিদা না খেয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে. মফিজুর অনেক বলেছে খেয়ে নিয়ে কিন্তু মেয়েটি কোনো দিন খেতো না. ( না খেয়ে থাকাটা. হয়তো. বোকামি ছাড়া কিছু নয়. কিন্তু সত্যি বলতে. এইটার নাম কিন্তু ভালোবাসা. একে অন্যের প্রতি গভীর টান একটি মেয়ে হয়তো এইটা খুব ভালো বোঝে. তাই না..)
    এই ভাবে সংসার খুব ভালো ভাবে চালাচ্ছিলো. তারা দুজন..
    মফিজুর বাড়ি প্রতিদিন কাজ থেকে ফিরে. রাতের বেলা খেয়ে নৌকা নিয়ে নদীতে যেতো. মাছ ধরতে. একদিন শাহিদা বললো. আমাকে আপনার সাথে. নিয়ে যাবেন.? মফিজুর বললো তুমি যাবা?
    হ্যা আপনি কিভাবে মাছ ধরেন আমি দেখবো. মফিজুর বললো. আচ্ছা চলো. যাই. এই বলে রাত একটু বাড়লে. দুজনে. নৌকা নিয়ে বের হলো. সেদিন আকাশ টা ছিলো অনেক পরিষ্কার.শাহিদা আলতা রাঙা পায়ে. নদীর পানিতে পা ভেজাতে লাগলো. আর মফিজুর দাড় বাইছে. দাড় বাইতে বাইতে. একটা জায়গায়. এসে. থামলো. মফিজুর. শাহিদা বললো থামলেন কেনো??
    মফিজুর বললো এই খানে জাল ফেলবো. 
    আচ্ছা ফেলেন. মফিজুর জাল ফেললো নদীতে. প্রথম খেপে. অনেক মাছ উঠলো. জোছনা আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিলো সব কিছু. চাঁদ টা নদীর পানিতে প্রতিফলিত হয়ে. চিক চিক করছিলো
    মফিজুর.জাল টেনে নৌকাই. উঠালো. শাহিদা সাথে সাথে কাছে এসে. বললো. মাছা পাইছেন. মফিজুর হাসি দিয়ে বললো. এই প্রথম বার. প্রথম খেপে এতো মাছ পেলাম.আজ তুমি আছো বলেই পেলাম. শাহিদা হাসি দিয়ে বললো নেন হইছে আরর আমাকে খুশী করতে হবেনা. মাছ গুলো ছাড়ান. মফিজুর মাছ গুলো ছাড়িয়ে. ব্যাগে রাখলো এই ভাবে আরো কয়েক খেপ এ অনেক মাছ.ধরলো. মফিজুর. মাছ ধরা শেষ. করে.মফিজুর শাহিদাকে বললো. চলো বাড়ির দিকে যায়. আজ আর ধরবোনা. শাহিদা বললো জানেন আমি না কখনো রাতে বের হয় নি. বাবা- মা বের হতে দিতো না. তারা বলতো তোর বিয়ের পর সামির সাথে বের হইস. কিন্তু আমার চাঁদ দেখতে ভালো লাগতো. আজ আমার সত্যি ভালো লাগছে আপনি আমাকে নিয়ে আসলেন বলে. মফিজুর শাহিদার পাশে বসে বললো. এই ভাবে তোমাকে খুশী দেখতে চাই আমিমি. শাহিদা বললো তাহলে আমাকে মাঝ নদীতে নিয়ে চলেন. নদীর মাঝ খানে বসে দুজন গল্প করবো. মফিজুর হাসি দিয়ে বললো. আচ্ছা বউ যখন বলেছে যেতে তো হবেই..
    মাফিজুর দাড় বেয়ে নদীর মাঝে চলে গেলো.. নদীর মাঝে যেয়ে খোলা আকাশের নিচে. শুধু তার দুজন নদীর পানিতে চাঁদ টা জোছনা আলোয় গোসল করছে. নিশাচর পাখিরা উড়ে বেড়াচ্ছে. আর রয়েছে মৃদু বাতাস. যেনো এই প্রকৃতি আজ তাদের জন্য সেজেছে. শাহিদা আর মফিজুর পাশাপাশি বসে আছে মফিজুর শাহিদার নরম হাত টা ধরলো. চাঁদের আলোয়. শাহিদার মুখটা. অন্য রকম মায়া ভরা লাছিলো. মফিজুর এক দৃষ্টিতে. শাহিদার দিকে তাকিয়ে আছে. আর শাহিদা মফিজুরের দিকে. কিছুক্ষণ পরে শাহিদা বললো কি দেখছেন এমন করে. মফিজুর বললো আমার বউ কে. শাহিদা বললো. এতো কি আছে দেখার? এতো দিন ধরে তো দেখছেন.
    মফিজুর বললো আজ তোমাকে অন্য রকম সুন্দর লাগছে. সত্যি অপরূপ আমি ধন্য তোমার মত একজন কে পেয়ে. শাহিদা হাসি দিলো মফিজুরের কথা শুনে. হাসিটা যেনো চাঁদের আলোয় ঝিকিমিকি করতেছিলো আর এই ভাবে জোছনা আলোয় ভালোবাসায়
    সময় টা পার করলো দুজন. এই দিকে ভোর প্রায় হতে চললো. শাহিদা বললো তাড়াতাড়ি বাড়ি চলুন. না হলে ভোর হয়ে যাবে.. মফিজুর দাড়া বেয়ে বাড়ি ফিরলো.. বাড়ি ফিরে নামাজ পড়ে হালকা ঘুম দিয়ে কাজের জন্য বের হয়ে গেলো.. সেদিন ছিলো হাটের দিন.. কাজ শেষে. টাকা পেয়েছে মফিজুর. আর হাট থেকে. গরুর মাংশ. পোলাও চাউল. আর মায়ের জন্য. শাড়ি বাবার জন্য লুঙ্গী. আর বউয়ের জন্য শাড়ি এবং কাজল. কারণ, মফিজুর বলেছিলো শাহিদাকে কাজল নিলে তাকে অনেক সুন্দর লাগে
    সব কিছু নিয়ে বাড়ি ফিরলে সবাই কে সব কিছু নিজ হাতে. দিয়ে দেই মফিজুর. রাতে যখন. শুতে যাবে. তখন দেখলো. শাহিদা তার দেওয়া. শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে ঘরে জলতে থাকা হারিকেনের আলোয় শাহিদাকে দেখে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মফিজুর. শাহিদা বললো. আজ আমাকে নিয়ে ঘুরতে যাবেন.? নদীতে. মফিজুর এক কথাই রাজি বললো চলো. 
    শাহিদা নৌকার এক পাশে বসে আছে আর মফিজুর দাড় বেয়ে যাচ্ছে. শাহিদার দিকে তাকিয়ে. এমন সময় মফিজুর গান গেয়ে উঠলো.
    “আমার কাজল কালো বউয়ের আখি
    দেইখা তোর মুখের হাসি 
    ভুইলা গেছি চাঁদের আলো
    তুই যে আমার পরাণ পাখি”
    শাহিদা গানটা শুনছিলো আর হাসছিলো.. সেদিন রাতে মাঝ নদীতে. শাহিদা মফিজুর কে বলছে জানেন. আপনাকে আমি অনেক ভালোবাসি আমি আপনার বাড়ি এসে একটা দিনের জন্যেও কষ্ট পাইনি. আমার না. আমার বাবা-মায়ের কাছে যেতে ভালো লাগেনা কারণ আপনার কাছে থাকলেই আমার সব চেয়ে বেশি ভালো লাগে. সারাদিন আপনি যখন বাড়ি থাকেন না. আমি রাস্তার দিকে চেয়ে থাকি কখন আপনি আসবেন আপনার হাত পা ধুয়িয়ে দিবো খাবার খায়িয়ে দিবো. মফিজুর বুঝতে পারলো শাহিদাকে সময় দেওয়ার দরকার তাই মনে মনে ভাবলো আমি যেহেতু ১০ ক্লাস পযন্ত পড়েছি.আর যুদ্ধ করেছি চাকরি ঠিক পেয়ে যাবো তাহলে শাহিদাকে সময় দিতে পারবো..
    শাহিদা মফিজুর কে ঠেলা দিয়ে বললো কি ভাবছেন আপনি.? 
    মফিজুর বললো কিছু না. 
    শাহিদা মফিজুর কে সেদিন গালে একটা চুমু দিয়েছিলো. চুমুটা দিয়েই লজ্জাই মুখ উচু করতে পারে না মফিজুর বললো হুম হইছে চলো বাড়ি যাই, শাহিদা বললো চলেন. এই বলে বাড়ির দিকে রওনা দিলো.
    সকাল বেলা শাহিদার বাবা এলো শাহিদাকে নিতে. বিয়ের পরে মেলানির পরে আর যাওয়া হয়নি বাপের বাড়ি. শাহিদা জানতে পারলো তার বাবা তাকে নিতে এসেছে. এইটা শুনে সে খুশী হয় নি. শাহিদা তার বাবা কে বললো. আজ থাকুন আপনার জামাই রাতে আসলে ও যেতে বললে যাবো. শাহিদা ভেবেছিলো. মফিজুর হয়তো ওকে যেতে দেবেনা. কিন্তু সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে মফিজুর কে বললে মফিজুর বললো. হুম তুমি বাবার সাথে যাও. তাদের ও তো ইচ্ছা করে তোমাকে দেখতে. তাই না তুমি তো তাদের শন্তান. শাহিদা বললো আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারবোনা. মফিজুর বললো আমি ৩-৪ দিন পর গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসবো অনেক কষ্টে রাজি করালো শাহিদাকে যাওয়ার সময় অনেক কেদেছিলো শাহিদা. 
    আর এই দিকে.মফিজুর একটা চাকরি গুছিয়ে ফেলে. সে ভাবলো এই সুংবাদ টা শাহিদাকে জানাতে হবে.
    মফিজুর শাহিদার কাছে যায়. ৪ দিন পর মফিজুর কে দেখে. ঘরের ভেতরে কেঁদে দেই মফিজুর ঘরে যেয়ে দেখলো. শাহিদা কাঁদছে. মফিজুর চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো. কাদতেছো কেনো?? এই তো আমি আসছি. শাহিদা বললো জানেন আমিম আপনাকে সব সময় মনে করেছি. এই চারটা দিন অনেক কষ্টে কেটেছে আপনাকে ছাড়া. আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারিনা. আমাকে কেউ গালে তুলে খায়িয়ে দেই না. রাত হলে কেউ ঘুরতে নিয়ে যায় না কেউ আমাকে খুশী করার জন্য কিছু করেনা. শুধু আপনি ছাড়া. আমি ভেবেছিলাম আপনি তাড়াতাড়ি আমাকে নিতে আসবেন কিন্তু, আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন না.
    মফিজুর বললো আমিও তোমাকে অনেক মনে করেছি আসোলে একটা কাজের জন্য ব্যস্ত ছিলাম তাই আস্তে পারিনি. শাহিদা বললো আপনার কাছে তো কাজ সব চেয়ে বড়. আমি নয়. মফিজুর বললো তুমি যদি শোনো. কি কাজ করছিলাম তুমিও খুশি হবে. শাহিদা বললো কি কাজ বলেন.?
    আমি চাকরি পেয়েছি. এখন থেকে আর রাত হবে না আসতে তাড়াতাড়ি আসতে পারবো তোমার কাছে থাকতে পারবো. শাহিদা কথাটি শুনে হাসি দিয়ে বললো সত্যি বলছেন?
    হ্যা সত্যি. শাহিদা মফিজুর কে জড়িয়ে ধরলো. তার পর বললো আমার জন্য কি আনছেন এতোতো দিন পরে আসলেন. মফিজুর পাঞ্জাবির পকেট থেকে কাচের চুরি বের করে বললেন এইটা এনেছি. শাহিদা দেখে অনেক খুশি.
    মফিজুর বললো আচ্ছা শোনো. তুমি নাকি এই কয় দিন খাওয়া দাওয়া করোনি?
    কেনো খাওনি.? শাহিদা বললো আপনাকে ছাড়া খেতে ভালো লাগেনা.
    মফিজুর চুপ করে থেকে বললো খাবার নিয়ে আসো. আমি খায়িয়ে দেবো. শাহিদা বললো কেউ দেখলে কি ভাববে.?
    মফিজুর বললো আমার বউ কে আমি খায়িয়ে দেবো যার যা খুশী বলুক.
    খাওয়া দাওয়া শেষ করে সেদিন দুজন বাড়ি ফিরে আসে.( আর এরই মাঝে কেটে গেলো ৯ মাস)
    মফিজুর যে টাকা বেতন পাই তা দিয়ে সংসার ভালো চলতো শাহিদার সাথেও সময় গুলো ভালো পার হচ্ছিলো. 
    বিয়ের ১ বছর পার হয়ে গেছে দুজনের মধ্যে ভালোবাসার গভীরতা এতোটাই বেশি যে কেউ কাওকে ছাড়া থাকতে পারেনা. আর সেটা বুঝি বিধাতা চাইলেন না.
    ১ বছর পরে. হঠাৎ শাহিদা মাথা ঘুরে পড়ে যায়. সবাই ভাবে শাহিদার বাচ্চা হবে. শাহিদাও সেটা ভেবে খুশি হলো. কিন্তু, আস্তে আস্তে.তার শরীর খারাপ হতে লাগলো. সুন্দর চেহারাটা আস্তে আস্তে কালো হতে লাগলো. চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে. 
    মফিজুর অনেক ডাক্টার কবিরাজ দেখিয়েছে. ওষুধ খেলে কিছুটা কমে আবার বেড়ে যায়. কোনো কিছু তে কোনো লাভ হয়নি. 
    এই দিকে শাহিদা বুঝতে পারছে সে হয়তো আর বাচবেনা. তাই মফিজুর কে বললো আপনি দয়াকরে আমার পাশে থাকুন কে জানে কখন আমি চলে যাই আমি আপনার কোলস মাথা রেখে মরতে চাই. মফিজুর কেদে দিয়ে বললো তোমার কিছু হবেনা আমি তোমাকে ইন্ডিয়া নিয়ে ভালো ডাক্তার দেখাবো শাহিদা বললো থাক আমি জানি তাতে লাভ হবেনা. আমার সময় শেষ. সেদিন রাতে শাহিদা মফিজুর কে বললো আমকে নিয়ে বাইরে যাবেন নৌকাই ঘুরাবেন.? মফিজুর বললো এই শরীরে কিভাবে যাবা.?
    শাহিদা বললো কেনো আপনি কোলে করে নিয়ে যাবেন. মফিজুর সেটাই করলো. মাঝ নদীতে যেয়ে আক্রান্ত শরীরে মফিজুর কে বলছে. আমি চলেলে গেলে. আপনি নতুন বিয়ে করবেন. আমার কবর টা বাড়ির পাশে দিবেন. যাতে আমি সব সময় আপনাকে দেখতে পারি. আমি চেয়েছিলা আপনার বাচ্চার মা হবো. সারাজীবন আপনার পাশে থাকবো. কিন্তু সেটা আর হলো না.
    আপনি নতুন বিয়ে করে,, তাকে ভালোবাসবেন তবে আমার থেকে বেশি ভালো আপনাকে কেউ বাসতে পারবে না. এইটা জেনে রাইখেন. শাহিদার কথা শুনে মফিজুর বললো আমি তোমাকে ছাড়া বাচতে পারবো না. আর তোমাকে যেতেও দেবো না..শাহিদা বললো দেখি কিভাব পারেন. আমাকে আটকে রাখতে.
    মফিজুর শাহিদাকে জড়িয়ে ধরে. বললো এই ভাবে আটকে রাখবো. শাহিদা হেসে দিলো. 
    রাত টা শেষ হওয়ার আগে বাড়ি ফিরলো দুজন. সেদিন অনেক কথা বলছিলো শাহিদা যেনো কথা শেষ হয় না. কিন্তু রাত হলে কথা বন্ধ হয়ে গেলো শাহিদার শুধু মফিজুরের দিকে তাকিয়ে.. আছে আর চোখের পানি ঝরাছে. মফিজুর. শাহিদার মুখে পানি দিচ্ছিলো বার বার. ঘর ভরা মানুষ. সারারাত জেগে আছে. ভোর হওয়ার আগেই শাহিদা মফিজুররে কোলে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে.
    মফিজুর শাহিদার মৃত মুখ দেখে চিৎকার করে. কেদে দিলো আর সাথে সাহে অজ্ঞান হয়ে গেলো। সবাই মফিজুরের মাথায় পানি ডেলে জ্ঞান ফিরালো। জ্ঞান ফিরে শাহদার কাছে বসে কাদতে লাহলো মফিজুর. আর পুরো সব কথা বলতে লাগলো. একজন এসে বললো মাটি কোথাই হবে? মফিজুর বললো আমার ঘরের কোণে..
    ঠিক সেই মোতাবেক কবর খুড়ে. মাটি দেওয়া হলো শাহিদার. সেদিন সারারাত কবরের পাশে বসে ছিলো কাদছিলো আর দোআ করছিলো. পুরোনো কথা গুলো মনে করে বলছিলো আমি একা একা কি করবো শাহিদা আমার পক্ষে তুমি ছাড়া কাওকে ভালোবাসা সম্ভব না. 
    এউ ভাবে সারারাত পার হলো. কয়েক দিন ধরে না খেয়ে একবার কবরের পাশে একবার ঘরে শাহিদার শাড়ি জড়িয়ে ধরে কাদছে..
    শাহিদার মৃত্যুর ৪ মাস পরে বাড়ি থেকে অনেক চাপ দেই বিয়ে করার জন্য. কিন্তু রাজি হয় নি. মফিজুর কারণ, মন একজন কে দেওয়া যায় আর সত্যি যদি কারো প্রতি ভালোবাসা সঠিক হয় তাকে কখনো ভোলা যায় না.
    তাই বুঝি আজ প্রায় ৪৭-৪৮ বছর. একাই আছে মফিজুর বিয়ে করেনি..।
    .
    (কিছু কিছু জীবন কাহিনী গল্প কেও হার মানিয়ে দেই. আপনারা এতক্ষণ যে গল্পটি পড়লেন. সেটা একটা বাস্তব গল্প. গল্পট ৮০% বাস্তবতা. আর ২০% গল্পটি উপস্থাপান করার জন্য আমার কিছু কথার যোগ. ঘটানাটি আমার জেলা নড়াইলে ঘটেছে. আর অনেক দিন ধরে চেষ্টাই ছিলাম ঘটনাটি পুরোটা শোনার কিন্তু শুনতে পারিনি. আজ পুরোটা জানলাম. সেই মফিজুর দাদুর কাছ থেকে.. উনি এখনো কবরের পাশে বসে কাদেন প্রতিটা দিন একটি দিন ও মিস নেই. উনি এখনো গরুর মাংস পোলাও ভাত খান না. শাহিদা চলে যাওয়ার পরে তার পছন্দের সব কিছু ত্যাগ করেন. রাতে আর মাছ ধরেন না. উনাকে অনেকে চিনতে পারেন যারা নড়াইলে থাকেন. তাই ছদ্মনাম দিলাম. উনি এখন একটি শিক্ষা প্রতিষ্টানে দফতরির চাকরি করছেন. উনার জন্য আর উনার বউয়ের জন্য সবাই দোআ করবেন. গল্পটি উনি যখন বলছিলেন বলতে বলতে নিজেই কেদে দিয়েছিলেন. আর আমি চুপ চাপ শুনেছি. কেমন লেগেছে জানিনা চেষ্টা করেছি গুছিয়ে লেখার,হয়তো পারিনি. আপনাদের মন্দব্যের অপেক্ষায় রইলাম. আশা করি ভালো থাকবেন সবাই. সেই দোআ করি. ধন্যবাদ,,,,

    Recent Articles

    Hands on: Beats PowerBeats Pro review

    In May, Uber launched a new experiment: selling train and bus tickets through its app for its customers in Denver, Colorado. Today, the company...

    New standalone app for macOS to be Like iTunes

    In May, Uber launched a new experiment: selling train and bus tickets through its app for its customers in Denver, Colorado. Today, the company...

    NASA spacecraft to collide a small moonlet in 2022

    In May, Uber launched a new experiment: selling train and bus tickets through its app for its customers in Denver, Colorado. Today, the company...

    The Google Nest Hub Max soups up the smart display

    In May, Uber launched a new experiment: selling train and bus tickets through its app for its customers in Denver, Colorado. Today, the company...

    Foldable iPhone 2020 release date rumours & patents

    In May, Uber launched a new experiment: selling train and bus tickets through its app for its customers in Denver, Colorado. Today, the company...

    Related Stories

    Leave A Reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    Stay on op - Ge the daily news in your inbox